পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৫০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২
জীবন-স্মৃতি।

করে নাই; করিলেও তখনকার শাসনপ্রণালীতে এখন কোনো ফল হইত না। ইহা বেশ দেখিয়াছি শিক্ষকের প্রদত্ত বিদ্যাটুকু শিখিতে শিশুরা অনেক বিলম্ব করে, কিন্তু শিক্ষকের ভাবখানা শিখিয়া লইতে তাহাদিগকে কোনো দুঃখ পাইতে হয় না। শিক্ষাদান ব্যাপারের মধ্যে যে সমস্ত অবিচার, অধৈর্য্য, ক্রোধ, পক্ষপাতপরতা ছিল অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয়ের চেয়ে সেটা অতি সহজেই আয়ত্ত করিয়া লইয়াছিলাম।—সুখের বিষয় এই যে, কাঠের রেলিঙের মত নিতান্ত নির্ব্বাক ও অচল পদার্থ ছাড়া আর কিছুর উপরে সেই সমস্ত বর্ব্বরতা প্রয়োগ করিবার উপায় সেই দুর্ব্বল বয়সে আমার হাতে ছিল না। কিন্তু যদিচ রেলিংশ্রেণীর সঙ্গে ছাত্রের শ্রেণীতে পার্থক্য যথেষ্ট ছিল তবু আমার সঙ্গে তার সঙ্কীর্ণচিত্ত শিক্ষকের মনস্তত্ত্বের লেশমাত্র প্রভেদ ছিল না।

 ওরিয়েণ্টাল সেমিনারিতে বোধ করি বেশি দিন ছিলাম না। তাহার পরে নৰ্ম্মাল স্কুলে ভৰ্ত্তি হইলাম। তখন বয়স অত্যন্ত অল্প। একটা কথা মনে পড়ে, বিদ্যালয়ের কাজ আরম্ভ হইবার প্রথমেই গ্যালারিতে সকল ছেলে বসিয়া গানের সুরে কি সমস্ত কবিতা আবৃত্তি করা হইত। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যাহাতে কিছু পরিমাণে ছেলেদের মনোরঞ্জনের আয়োজন থাকে নিশ্চয় ইহার মধ্যে সেই চেষ্টা ছিল। কিন্তু গানের কথাগুলো ছিল ইংরাজি, তাহার সুরও তথৈবচ—আমরা যে কি মন্ত্র আওড়াইতেছি এবং কি অনুষ্ঠান করিতেছি তাহা কিছুই বুঝিতাম ন। প্রত্যহ সেই একটা অর্থহীন একঘেয়ে ব্যাপারে যোগ দেওয়া আমাদের কাছে সুখকর ছিল না। অথচ ইস্কুলের কর্ত্তৃপক্ষেরা তখনকার কোনো একটা থিওরি অবলম্বন করিয়া বেশ নিশ্চিন্ত ছিলেন যে তাঁহারা ছেলেদের আনন্দবিধান করিতেছেন; কিন্তু প্রত্যক্ষ ছেলেদের দিকে তাকাইয় তাহার ফলাফল বিচার করা সম্পূর্ণ বাহুল্য বোধ করিতেন। যেন তাঁহাদের থিওরি অনুসারে আনন্দ পাওয়া ছেলেদের একটা কৰ্ত্তব্য, না পাওয়া তাহাদের অপরাধ। এই জন্য যে ইংরেজী বই হইতে তাঁহারা থিওরি সংগ্ৰহ করিয়াছিলেন তাহা হইতে আস্ত ইংরেজি গানটা তুলিয়া তাঁহারা আরাম বোধ করিয়াছিলেন। আমাদের মুখে সেই ইংরেজিটা কি ভাষায় পরিণত হইয়াছিল তাহার আলোচনা