পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।



২৩
নৰ্ম্মাল স্কুল ।

শব্দ-তত্ত্ববিদ্‌গণের পক্ষে নিঃসন্দেহ মূল্যবান। কেবল একটা লাইন মনে পড়িতেছে—

 “কলোকী পুলোকী সিংগিল মেলালিং মেলালিং মেলালিং।”

 অনেক চিন্তা করিয়া ইহার কিয়দংশের মূল উদ্ধার করিতে পারিয়াছি—কিন্তু “কলোকী” কথাটা যে কিসের রূপান্তর তাহা আজও ভাবিয়া পাইনাই। বাকি অংশটা আমার বোধ হয় “Full of glee, singing merrily, merrily, merrily.”

 ক্রমশঃ নৰ্ম্মাল স্কুলের স্মৃতিটা যেখানে ঝাপ্‌সা অবস্থা পার হইয়া স্ফুটতর হইয়া উঠিয়াছে সেখানে কোনো অংশেই তাহা লেশমাত্র মধুর নহে। ছেলেদের সঙ্গে যদি মিশিতে পারিতাম তবে বিদ্যাশিক্ষার দুঃখ তেমন অসহ্য বোধ হইত না। কিন্তু সে কোনমতেই ঘটে নাই। অধিকাংশ ছেলেরই সংস্রব এমন অশুচি ও অপমানজনক ছিল যে ছুটির সময় আমি চাকরকে লইয়া দোতলায় রাস্তারদিকের এক জানালার কাছে একলা বসিয়া কাটাইয়া দিতাম। মনে মনে হিসাব করিতাম, এক বৎসর, দুই বৎসর, তিন বৎসর—আরো কত বৎসর এমন করিয়া কাটাইতে হইবে। শিক্ষকদের মধ্যে একজনের কথা অামার মনে আছে তিনি এমন কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করিতেন যে তাঁহার প্রতি অশ্রদ্ধাবশতঃ তাহার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর করিতাম না। সম্বৎসর তাঁহার ক্লাসে আমি সকল ছাত্রের শেষে নীরবে বসিয়া থাকিতাম। যখন পড়া চলিত তখন সেই অবকাশে পৃথিবীর অনেক দুরূহ সমস্যার মীমাংসচেষ্টা করিতাম। একটা সমস্যার কথা মনে আছে। অস্ত্রহীন হইয়াও শক্রকে কি করিলে যুদ্ধে হারানো যাইতে পারে সেটা আমার গভীর চিন্তার বিষয় ছিল। ঐ ক্লাশের পড়াশুনার গুঞ্জনধ্বনির মধ্যে বসিয়া ঐ কথাটা মনে মনে আলোচনা করিতাম তাহা আজও আমার মনে আছে। ভাবিতাম কুকর বাঘ প্রভৃতি হিংস্ৰজন্তুদের খুব ভাল করিয়া শায়েস্তা করিয়া প্রথমে তাহাদের দুই চারি সার যুদ্ধক্ষেত্রে যদি সাজইয়া দেওয়া যায় তবে লড়াইয়ের আসরের মুখবন্ধটা বেশ সহজেই জমিয়া ওঠে; তাহার পরে নিজেদের বাহুবল কাজে খাটাইলে জয়লাভটা নিতান্তু অসাধ্য হয়