তাহার নীচের এক সেঁতালে ঘরে আমি থাকিতাম। বাবুর এক চাকরাণী ব্যতীত অন্য চাকর ছিল না। তাঁহার গৃহিণী স্বয়ং রন্ধন করিতেন। রান্না হইত—অস্ততঃ আমার ও ঝিয়ের জন্য—মুসূর দাল ও বেগুন বা আলু বা কুমড়া ভাজা। মুসূর দালে কেবল একটু হলুদের রং দেখিতে পাইতাম,দালের সম্পর্ক তাহাতে থাকিত কিনা সন্দেহ। তাহার পর বলিহারি যাই গৃহিণীর হাত! কি করিয়া যে তিনি সেরূপ ঝিঁঝির পাতের ন্যায় বেগুণ কুটিতেন, তাহাই আশ্চর্য্য। অভ্রের চেয়ে বোধ হয় পাতলা। বাজারে যে চিংড়ি মাছ বিক্রয় হইত না, যাহার বর্ণ লাল হইয়া যাইত, বেলা একটার সময় কালে-ভদ্রে সেই চিংড়ি মাছ আসিত। তাহার গন্ধে পাড়ার লোককে নাকে কাপড় দিতে হইত। সেই চিংড়ি মাছের ধড়গুলি বাবু ও তাঁহার গৃহিণী খাইতেন মাথাগুলি আমাদের জন্য ঝাল দিয়া রান্না হইত। যেদিন চিংড়ি মাছ হইত, সেদিন আমাদের আহ্লাদের সীমা থাকিত না। সেই পচা চিংড়ি অমৃত জ্ঞান করিয়া আমরা খাইতাম। দুইবার ভাত চাহিয়া লইতাম। অধিক ভাত খরচ হইত বলিয়া চিংড়ি কিছুদিন পরে বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। তাহার পর একগাঁট তেঁতুল ট্যাকে করিয়া আমি ভাত খাইতে বসিতাম। তাহা দিয়া কোনরূপে ভাত উদরস্থ করিতাম। যাহা হউক, এই স্থানে যাহা আমি শিক্ষা পাইয়াছিলাম, পরে তাহাতে আমার বিশেষ উপকার হইয়াছিল। আমি বুঝিয়াছিলাম যে, টাকা উপার্জ্জন করিলেই টাকা থাকে না; টাকা খরচ না করিলেই টাকা থাকে।
আমার বোধ হয় রাক্ষস গণ। আমার যখন পঁচিশ বৎসর বয়স, তখন আমার প্রথম গৃহিণীর কাল হইল। তাঁহার সন্তানাদি হয় নাই। তাহার পর দশ বৎসর পর্য্যন্ত আমার আর বিবাহ হইল না। আমার অবস্থা সেই; লোকে বিবাহ দিবে কেন?
এই সময় পাশের বাড়ী আমাদের এক স্বজাতি ভাড়া লইলেন। তাঁহার নাম প্রহ্লাদ সেন। দোতালায় সপরিবারে তিনি বাস করিলেন। একজন আত্মীয়কে নীচের দুইটী ঘর ভাড়া দিলেন। তাঁহার নাম গোলোক