হইয়াছে; শ্লোকপাদের শেষ কথায় মন্ত প্রসঙ্গ; তাহার সহিত পূর্ব্ব কথার সমন্বর নাই। রঘুবংশের অন্যত্র—
“সমমেব সমাক্রান্তং দ্বয়ং দ্বিরদগামিনা।
তেন—সিংহাসনং পিত্র্যমখিলং চারিমণ্ডলং॥”—৪র্থ সর্গ, ৪ শ্লোক।এই শ্লোকেও “তেন” পদে অর্থের শেষ হইয়াছে, অথচ সেই স্থান যতির নহে। কিরাতার্জ্জুনীয়ে যথা—
"কৃতপ্রণামস্য মহীং মহীভূজে
জিতাং সপত্নেন নিবেদয়িতঃ।
ন বিব্যথে তস্য মনঃ—নহি প্রিয়ং,
প্রবক্তুমিচ্ছন্তি মৃষা হিতৈষিণঃ॥”এই শ্লোকে তৃতীয় পাদের “মনঃ” পদে অর্থের শেষ হইয়াছে। তৎপরের “নহি প্রিয়ং” ইত্যাদি বাক্যের সহিত তাহার কোন সমন্বয় নাই। এতাদৃশ অপর দৃষ্টান্ত অনেক সংগ্রহ করা যাইতে পারে; পরন্তু তাহার প্রয়োজন নাই। প্রদত্ত উদাহরণেই পাঠকবৃন্দ নিশ্চিত হইবেন যে, পদমধ্যে অর্থের শেষ করায় হানি হয় না, এবং তিলোত্তমায় যে পদের প্রারম্ভে বা মধ্যে যে সকল বিরাম আছে, তাহা কোন মতে প্রকৃত যতির হানিকর নহে। দত্তজ লেখেন—
“এ হৈম নির্জ্জন স্থানে দেব পুরন্দর,
কেন গো বসিয়া আজি, কহ পদ্মাসনা,
বীণাপাণি। কবি, দেবি, তব পদাম্বুজে,
নমিয়া জিজ্ঞাসে তোমা, কহ, দয়াময়ি!”এই পাদ-চতুষ্টয়ের তৃতীয় পাদের “বীণাপাণি” পদে অর্থ শেষ হইয়াছে; কিন্তু তাহাতে যতির ভঙ্গ হয় নাই, যেহেতু তিলোত্তমার ছন্দঃ অমিত্রাক্ষর পয়ার, তাহার লক্ষণ চতুর্দ্দশাক্ষর বৃত্তি, অষ্টমাক্ষরে যতি, এবং এই লক্ষণ রক্ষা পাইলেই ছন্দের রক্ষা মানিতে হইবে। সেই লক্ষণাক্ষুসারে “স্থানে,” “আজি,” “দেবি” ও “তোমা” পদের পর যতি আছে; সেই যতিতেই ছন্দের অনুরোধ রক্ষা পায়; বীণাপাণি শব্দের পর পৃথক্ যতি থাকায় তাহার হানি হয় না। যদ্যপি এই নিয়মের অন্যথায় অষ্টমাক্ষরের পর যতি না থাকে, তাহা হইলে কাব্যকর্ত্তাকে যতি-ভঙ্গ-দোষ স্বীকার করিতে হইবে। এক পদে চতুর্দশাক্ষরের অধিক বা অল্প থাকে, তাহা হইলে তাঁহাকে ছন্দোভঙ্গ অঙ্গীকার করিতে হয়।
প্রস্তাবিত ছন্দের পাঠ করিবার নিয়ম স্বতন্ত্র। সামান্য পয়ারের ন্যায় ইহা পাঠ করিলে, অর্থেরও অনুভব হইবেক না এবং কাব্যও পদ্য বলিয়া বোধ হইবেক না। যাঁহারা ইংরাজী ভাবা জ্ঞাত আছেন, তাঁহারা যে প্রকারে মিল্টন্ কবি কৃত “পারাডাইস লষ্ট” নামক কাব্য পাঠ করেন, তদ্রূপে ইহার পাঠ করিলে সিদ্ধকাম হইবেন। অন্যের প্রতি বক্তব্য যে, তাঁহারা পয়ারের অষ্টম ও চতুর্দ্দশাক্ষরে যতি
পাতা:তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য - মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৯৬১).pdf/১৮
অবয়ব
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৷৹
মধুসূদন-গ্রন্থাবলী