বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য - মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৯৬১).pdf/৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

ভূমিকা

 ১২৮৭ সালের ৩০ চৈত্র কলিকাতার “সাবিত্রী লাইব্রেরী”র দ্বিতীয় বাৎসরিক অধিবেশনে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী “বাঙ্গালা সাহিত্য। (বর্ত্তমান শতাব্দীর)” আলোচনায় বলিয়াছিলেন—

 আমরা মাইকেলের তিলোত্তমাসম্ভব প্রকাশ হইতে নূতন সাহিত্যের উৎপত্তি ধরিয়া লইব। যদি ইহার পূর্ব্বে এরূপ নূতন সাহিত্যের কিছু থাকে, কেহ আমাদিগের সেই ভ্রমান্ধকার দূর করিয়া দিলে একাস্ত বাধিত হইব।

 বস্তুতঃ ক্রান্তিকারী বা যুগান্তকারী গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে যদি একটিও প্রকাশিত হইয়া থাকে, তাহা হইলে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ সেই গ্রন্থ। বাংলা গদ্য-সাহিত্যে ‘বেতালপঞ্চবিংশতি,’ ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ও ‘দুর্গেশনন্দিনী’ সমবেতভাবে যে পরিবর্ত্তন আনিয়াছে, বাংলা কাব্যসাহিত্যে একা ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ সেই পরিবর্ত্তন আনিতে সক্ষম হইয়াছে।

 এই কাব্যখানি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষার গতি ও প্রকৃতি আমূল পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। পয়ার এবং ত্রিপদীর একঘেয়ে পদচারণের মধ্যে বাংলা কাব্য প্রায় মুমূর্ষু হইয়া আসিয়াছিল; ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে’ অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ করিয়া মধুসূদন যেন মৃতদেহে জীবন সঞ্চার করিলেন। শুধু কাব্য নয়, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্ত্তনে বাংলা-গদ্যও সতেজ ও ওজস্বী হইবার অবকাশ পাইয়াছে।

 ইংরেজী ব্ল্যাঙ্ক ভার্সের আদর্শে এই নূতন ছন্দে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ রচনার ইতিহাস কৌতুককর। যোগীন্দ্রনাথ বসুর ‘জীবন-চরিতে’র (তৃতীয় সংস্করণ) ২৫৭ হইতে ২৬০ পৃষ্ঠায় এবং নগেন্দ্রনাথ সোমের ‘মধু-স্মৃতি’র ১২৪ হইতে ১৩০ পৃষ্ঠায় এই কাহিনী বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ আছে। ব্ল্যাঙ্ক ভার্সে রচিত পাশ্চাত্য মহাকাব্যের সহিত মধুসূদনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল বলিয়াই তিনি যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে অমিত্রচ্ছন্দে বাংলা কাব্য রচনার দায়িত্ব লইয়া বাজি রাখিতে পারিয়াছিলেন। শিক্ষা, সাধনা, পাণ্ডিত্য ও আত্মপ্রত্যয়ের সহিত অসামান্য কবিপ্রতিভা যুক্ত হওয়াতে তিনি অত্যল্পকালমধ্যেই সে বাজি জিতিতেও সক্ষম হইয়াছিলেন। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ স্বয়ং যতীন্দ্রমোহন দিয়াছেন। ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দের ১ ডিসেম্বর গৌরদাস বসাকের নিকট এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন—