সাহেবের জন্য একখানা রূপার চৌকি রাখা হইয়াছিল, সাহেব তাহাতে বসিলেন। রঙ্গরাজ খুঁজিতে লাগিলেন, দেবী কোথা? দেখিলেন, কামরার এক ধারে দেবীর সহজ বেশে দেবী দাঁড়াইয়া আছে, গড়া পরা, কেবল কড় হাতে, এলোচুল, কোন বেশভূষা নাই।
সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে দেবী চৌধুরাণী? কাহার সঙ্গে কথা কহিব?”
নিশি বলিল, “আমার সঙ্গে কথা কহিবেন। আমি দেবী।”
দিবা হাসিল, বলিল, “ইংরেজ দেখিয়া রঙ্গ করিতেছিস্? এ কি রঙ্গের সময়? লেফ্টেনাণ্ট্ সাহেব! আমার এ ভগিনী কিছু রঙ্গ তামাসা ভাল বাসে, কিন্তু এ তার সময় নয়। আপনি আমার সঙ্গে কথা কহিবেন—আমি দেবী চৌধুরাণী।”
নিশি বলিল, “আ মরণ! তুই কি আমার জন্য ফাঁসি যেতে চাস্ না কি?” সাহেবের দিকে ফিরিয়া নিশি বলিল, “সাহেব, ও আমার ভগিনী—বোধ হয়, স্নেহবশতঃ আমাকে রক্ষা করিবার জন্য আপনাকে প্রতারণা করিতেছে। কিন্তু কেমন করিয়া মিথ্যা প্রবঞ্চনা করিয়া, বহিনের প্রাণদণ্ড করিয়া, আপনার প্রাণ রক্ষা করিব? প্রাণ অতি তুচ্ছ, আমরা বাঙ্গালির মেয়ে, অক্লেশে ত্যাগ করিতে পারি। চলুন, আমাকে কোথায় লইয়া যাইবেন, যাইতেছি। আমিই দেবী রাণী।”
দিবা বলিল, “সাহেব! তোমার যিশু খ্রীষ্টের দিব্য, তুমি যদি নিরপরাধিনীকে ধরিয়া লইয়া যাও। আমি দেবী।”
সাহেব বিরক্ত হইয়া রঙ্গরাজকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ কি তামাসা? কে দেবী চৌধুরাণী, তুমি যথার্থ বলিবে?”
রঙ্গরাজ কিছু বুঝিল না, কেবল অনুভব করিল যে, ভিতরে একটা কি কৌশল আছে। অতএব বুদ্ধি খাটাইয়া সে নিশিকে দেখাইয়া, হাত যোড় করিয়া বলিল, “হুজুর! এই যথার্থ দেবী রাণী।”
তখন দেবী প্রথম কথা কহিল। বলিল, “আমার ইহাতে কথা কহা বড় দোষ। কিন্তু কি জানি, এর পর মিছা কথা ধরা পড়িলে, যদি সকলে মারা যায়, তাই বলিতেছি, এ ব্যক্তি যাহা বলিতেছে, তাহা সত্য নহে।” পরে নিশিকে দেখাইয়া বলিল, “এ দেবী নহে। যে উহাকে দেবী বলিয়া পরিচয় দিতেছে, সে রাণীজিকে মা বলে, রাণীজিকে মার মত ভক্তি করে, এই জন্য সে রাণীজিকে বাঁচাইবার জন্য অন্য ব্যক্তিকে নিশান দিতেছে।”
তখন সাহেব দেবীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেবী তবে কে?”
দেবী বলিল, “আমি দেবী।”