৶৹
পরিস্ফুট। দেবীচৌধুরাণীর ক্ষেত্র অতি সুন্দর না হইলেও মনোহর বটে। দেবীচৌধুরাণী যেন বৈষ্ণবের হাতের শক্তি-মূর্ত্তি—কমলা নহে, ভৈরবী নহে, কালীও নহে; অথচ তিনের সমন্বয়ে এক অপূর্ব্ব বৈষ্ণবঠাকুরাণী। যখন শক্তি-মূর্ত্তি, তখন পুরুষ সম্মুঢ়; ব্রজেশ্বর পিতৃশাসনে সম্মুঢ়, প্রফুল্লর রূপে সম্মুঢ়। এই পুরুষের তৃপ্তি-তুষ্টি সাগর বৌ, বিরক্তি ও বিধৃতি নয়ান বৌ এবং ঐশ্বর্য্য ও আকাঙ্ক্ষা প্রফুল্ল বা দেবীচৌধুরাণী। প্রফুল্লকে সর্ব্বৈশ্বয্য-শালিনী করিতে যাইয়া কবি গোলে পড়িয়াছেন। প্রফুল্লকে এক রাত্রির জন্য স্বামিসঙ্গে সুখী করিয়া কবি সর্ব্বৈশ্বর্য্যের পথে একটা কণ্টক বিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন। তাহার পরিণাম দেবীরাণীর ব্রজেশ্বরের গৃহে আসিয়া বাসন মাজা—ঘরসংসার দেখা। যেমন কর্ম্মী তেজস্বী ব্রাহ্মণ ডাকাতের হাত দিয়া কবি দেবীরাণীকে গড়িয়া তুলিলেন, সে গড়নের ফলে পুরুষ ব্রজেশ্বর সোনা হইয়া যাইবার কথা। কিন্তু কবি প্রফুল্লের সংস্পর্শে ব্রজেশ্বরের মানবতার উন্মেষ-ভঙ্গী দেখান নাই। যেন প্রফুল্ল আসাতেই নয়ান বৌয়ের ঝগড়া থামিল, সাগর বৌয়ের অভিমান দূর হইল, আর ব্রজেশ্বর যেন “নিত্যঃ সর্ব্বগতঃ স্থাণুরচলোয়ং সনাতনঃ” পুরুষের হিসাবে, প্রফুল্লের প্রতি কৃতজ্ঞ হইয়া, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—প্রফুল্ল, সাগর ও নয়ান বৌ—এই তিন গুণে বিচরণ করিতে লাগিলেন। এই তিনের সমাধান করিলেন প্রফুল্ল, সংসারে একটা negative সুখের বা স্বস্তির লহর তুলিলেন প্রফুল্ল, ফলভাগী হইল ব্রজেশ্বর। এই টুকুর জন্য প্রফুল্লকে ব্যাকরণ, অলঙ্কার, দর্শন, বিজ্ঞান, সবই শিখিতে হইল, কুস্তী করিতে হইল, লাঠি খেলিতে হইল, নানা ভঙ্গীতে ত্যাগের মক্স করিতে হইল, দেবীরাণীর দোকানদারী বসাইতে হইল, ডাকাতের দলের সর্দ্দার হইতে হইল! ভবানী পাঠকের গুরুগিরির পর্য্যবসান হইল সাদামাঠা গৃহস্থের কুলাঙ্গনার ঘর-গৃহস্থলীর কার্য্যে— বাসনমাজায় ও সপত্নী বশীকরণে। আদিরসের কবি আদিরসটুকু ভুলিতে পারেন নাই, domesticityর লোভটুকু সামলাইতে পারেন নাই। এতটা শিক্ষার পরেও প্রফুল্ল বৈষ্ণবী হইতে পারিলেন না, তান্ত্রিক মতে শাক্ত ভৈরবী হইতেও পারেন নাই।...কিন্তু প্রফুল্ল-চরিত্র অপূর্ব্ব; উহা বাঙ্গালার নহে, অথচ বেশ বাঙ্গালীয়ানা মাখান। উহা বাঙ্গালীর ঘরে কখনও ছিল না, বাঙ্গালীর ঘরে কখনও হইবে না।
জাজপুর হইতে বদলি হইয়া বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি তারিখে হাওড়ার ডেপুটি ম্যাজিট্রেট হন। জাজপুরেই ‘দেবী চৌধুরাণী’ রচনার সূত্রপাত। শচীশচন্দ্রের ‘বঙ্কিম-জীবনী’তে (৩য় সংস্করণ, পৃ. ১৩১-৩৩) এই সময়ের একটি ডাকাতির উল্লেখ অছে, বঙ্কিমচন্দ্র যাহার অভিজ্ঞতা ‘দেবী চৌধুরাণী’তে প্রয়োগ করিয়াছেন। ওয়েস্ট্মেকট সাহেব তখন হাওড়ার ম্যাজিট্রেট। বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত তাঁহার সুরু হইতেই খিটিমিটি বাধিয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র কলিকাতায় বউবাজার স্ট্রীটে বাসা লইয়া, সেখান হইতে হাওড়া যাতায়াত করিতেন। সঞ্জীবচন্দ্র-সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শনে’র অবস্থা তখন কাহিল, মার্চ মাস পর্য্যন্ত (১২৮৯, চৈত্র) কোনও রকমে বাহির হইয়া তাহা বন্ধ হইয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র