সাগর বাহির হইতে কপাট টানিয়া দিয়া, শিকল লাগাইয়া, কুলুপে চাবি ফিরাইয়া বন্ধ করিয়া, দুড়্ দুড়্ করিয়া ছুটিয়া পলাইল। ব্রজেশ্বর, কুলুপ পড়িল শুনিতে পাইয়া, “কি কর, সাগর! কি কর, সাগর!” বলিয়া চেঁচাইল। সাগর কিছুতেই কাণ না দিয়া দুড়্ দুড়্ ঝম্ ঝম্ করিয়া ছুটিয়া একেবারে ব্রহ্মঠাকুরাণীর বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িল।
ব্রহ্মঠাকুরাণী বলিলেন, “কি লা সাগর বৌ? কি হয়েছে? এখানে এসে শুলি যে?”
সাগর কথা কয় না।
ব্রহ্ম। তোকে ব্রজ তাড়িয়ে দিয়েছে না কি?
সা। তা নইলে আর তোমার আশ্রমে আসি? আজ তোমার কাছে শোব।
ব্রহ্ম। তা শো শো! এখনই আবার ডাক্বে এখন! আহা! তোর ঠাকুরদাদা এমন বার মাস ত্রিশ দিন আমায় তাড়িয়ে দিয়েছে। আবার তখনই ডেকেছে—আমি আরও রাগ করে যেতাম না—তা মেয়েমানুষের প্রাণ ভাই! থাক্তেও পারিতাম না। এক দিন হলো কি—
সা। ঠান্দিদি, একটা রূপকথা বল না।
ব্রহ্ম। কোন্টা বলবো, বিহঙ্গম বিহঙ্গমীর কথা বল্বো? এক্লা শুন্বি, তা নূতন বৌটা কোথায়? তাকে ডাক্ না—দুজনে শুন্বি।
সা। সে কোথা, আমি এখন খুঁজিতে পারি না। আমি একাই শুন্বো তুমি বল।
ব্রহ্মঠাকুরাণী তখন সাগরের কাছে শুইয়া বিহঙ্গমের গল্প আরম্ভ করিলেন। সাগর তাহার আরম্ভ হইতে না হইতেই ঘুমাইয়া পড়িল। ব্রহ্মঠাকুরাণী সে সংবাদ অনবগত, দুই চারি দণ্ড গল্প চালাইলেন; পরে যখন জানিতে পারিলেন, শ্রোত্রী নিদ্রামগ্না, তখন দুঃখিত চিত্তে মাঝখানেই গল্প সমাপ্ত করিলেন।
পরদিন প্রভাত হইতে না হইতেই সাগর আসিয়া, ঘরের কুলুপ খুলিয়া দিয়া গেল। তার পর কাহাকে কিছু না বলিয়া ব্রহ্মঠাকুরাণীর ভাঙ্গা চরকা লইয়া, সেই নিদ্রামগ্না বর্ষীয়সীর কাণের কাছে ঘেনর ঘেনর করিতে লাগিল।
“কটাশ—ঝনাৎ” করিয়া কুলুপ শিকল খোলার শব্দ হইল—প্রফুল্ল ও ব্রজেশ্বর তাহা শুনিল। প্রফুল্ল বসিয়াছিল—উঠিয়া দাঁড়াইল, বলিল, “সাগর শিকল খুলিয়াছে, আমি চলিলাম। স্ত্রী বলিয়া স্বীকার কর না কর, দাসী বলিয়া মনে রাখিও।”