পাতা:দেবী চৌধুরানী - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/৭৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বড় ধুম পড়িয়ছে। ব্ৰজেশ্বর শ্বশুরবাড়ী আসিয়াছেন। কোন শ্বশুরবাড়ী, তাহা । বলা বাহুল্য। সাগরের বাপের বাড়ী। তখনকার দিনে একটা জামাই আসা বড় সহজ ব্যাপার ছিল না। তাতে আবার ব্রজেশ্বর শ্বশুরবাড়ী সচরাচর আসে না। পুকুরে পুকুরে, মাছমহলে ভারি হুটাহাট, ছুটাছুটি পড়িয়া গেল। জেলের দৌরাত্ম্যে প্রাণ আর রক্ষা হয় না। জেলে-মাগীদের হাটাহঁাটিতে পুকুরের জল কালী হইয়া যাইতে লাগিল। মাছ চুরির আশায় ছেলেরা পাঠশালা ছাড়িয়া দিল। দই, দুধ, ননী, ছান, সর, মাখনের ফরমাইসের জালায় গোয়ালার মাথা বেঠিক হইয়া উঠিল ; সে কখনও এক সের জল মিশাইতে তিন সের মিশাইয়া ফেলে, তিন সের মিশাইতে এক সের মিশাইয়া বসে। কাপড়ের ব্যাপারীর কাপড়ের মোট লইয়া যাতায়াত করিতে করিতে পায় ব্যথা হইয়া গেল ; কাহারও পছন্দ হয় না, কোন ধুতি চাদর কে জামাইকে দিবে। পাড়ার মেয়ে মহলে বড় হাঙ্গামা পড়িল। যাহার যাহার গহনা আছে, তারা সে সকল সারাইতে, মাজিতে, ঘষিতে, নূতন করিয়া গাথাইতে লাগিল। যাহাদের গহনা নাই, তাহারা চুড়ি কিনিয়া, শাখা কিনিয়া, সোনা রূপা চাহিয়া চিন্তিয়া এক রকম বেশভূষার যোগাড় করিয়া রাখিল—নহিলে জামাই দেখিতে যাওয়া হয় না। র্যাহাঁদের রসিকতার জন্ত পশার আছে—তাহারা দুই চারিট প্রাচীন তামাশা মনে মনে ঝালাইয়া রাখিলেন ; যাহাদের পশার নাই, তাহার চোরাই মূল পাচার করিবার চেষ্টায় রহিল। কথার তামাশা পরে হবে-খাবার তামাশা আগে । তাহার জন্য ঘরে ঘরে কমিটি বসিয়া গেল। বহুতর কৃত্রিম আহাৰ্য্য, পানীয়, ফল-মূল প্রস্তুত হইতে লাগিল। মধুর অধরগুলি মধুর হাসিতে ও সাধের মিশিতে ভরিয়া যাইতে লাগিল । কিন্তু যার জন্য এত উদ্যোগ, তার মনে সুখ নাই। ব্রজেশ্বর আমোদ আহলাদের জন্য শ্বশুরালয়ে আসেন নাই। বাপের গ্রেপ্তারির জন্ত পরওয়ানা বাহির হইয়াছে—রক্ষার উপায় নাই। কেই টাকা ধার দেয় না। শ্বশুরের টাকা আছে—শ্বশুর ধার দিলে দিতে পারে, তাই ব্ৰজেশ্বর শ্বশুরের কাছে আসিয়াছেন । শ্বশুর বলিলেন, “বাপু হে, আমার যে টাকা, সে তোমারই জন্ত আছে—আমার আর কে আছে, বল ? কিন্তু টাকাগুলি যত দিন আমার হাতে আছে, তত দিন আছে,—তোমার বাপকে দিলে কি আর থাকবে ? মহাজনে খাইবে । অতএব কেন আপনার ধন আপনি নষ্ট করিতে চাও ?”