পাতা:দেবী চৌধুরানী - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/৮০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


蝴 দেবী চৌধুরাণী উপর তেমন যৌবনের লাবণ্য কোথাও পাওয়া যায় না। বয়স যাই হউক—সে স্ত্রীলোক পরম সুন্দরী, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। এ সুন্দরী কৃশাঙ্গী নহে—অথচ স্কুলাঙ্গী বলিলেই ইহার নিন্দ হইবে। বস্তুতঃ ইহার অবয়ব সৰ্ব্বত্র ষোল কলা সম্পূর্ণ—আজি ত্রিস্রোতা যেমন কুলে কুলে পূরিয়াছে, ইহারও শরীর তেমনই কুলে কুলে পূরিয়াছে। তার উপর ৰিলক্ষণ উন্নত দেহ। দেহ তেমন উন্নত বলিয়াই স্কুলাঙ্গী বলিতে পারিলাম না। যৌবন-বর্ষার চারি পোয় বন্যার জল, সে কমনীয় আধারে ধরিয়াছে—ছাপায় নাই। কিন্তু জল কুলে কুলে পুরিয়া টল টল করিতেছে—অস্থির হইয়াছে। জল অস্থির, কিন্তু নদী অস্থির নহে ; নিস্তরঙ্গ। লাবণ্য চঞ্চল, কিন্তু সে লাবণ্যময়ী চঞ্চলা নহে—নির্বিবকার। সে শান্ত, গম্ভীর, মধুর, অথচ আনন্দময়ী ; সেই জ্যোৎস্নাময়ী নদীর অনুষঙ্গিনী । সেই নদীর মত, সেই সুন্দরীও বড় মুসজ্জিতা । এখন ঢাকাই কাপড়ের তত মৰ্য্যাদা নাই—কিন্তু এক শত বৎসর আগে কাপড়ও ভাল হইত, উপযুক্ত মৰ্য্যাদাও ছিল । ইহার পরিধানে একখানি পরিষ্কার মিহি ঢাকাই, তাতে জরির ফুল । তাহার ভিতর হীরা-মুক্তা-খচিত কঁাচলি ঝকমক্‌ করিতেছে। হীরা, পান্ন, মতি, সোনায় সেই পরিপূর্ণ দেহ মণ্ডিত ; জ্যোৎস্নার আলোকে বড় ঝকমক করিতেছে। নদীর জলে যেমন চিকিমিকি—এই শরীরেও তাই। জ্যোৎস্নাপুলকিত স্থির নদীজলের মত—সেই শুভ্র বসন ; আর জলে মাঝে মাঝে যেমন জ্যোৎস্নার চিকিমিকি চিকিমিকি—শুভ্র বসনের মাঝে মাঝে তেমনি হীরা, মুক্ত মতির চিকিমিকি । আবার নদীর যেমন তীরবর্তী বনচ্ছায়, ইহারও তেমনি অন্ধকার কেশরাশি আলুলায়িত হইয়া অঙ্গের উপর পড়িয়ছে। কোকড়াইয়া, ঘুরিয়া ঘুরিয়া, ফিরিয়া ফিরিয়া, গোছায় গোছায় কেশ পুষ্ঠে, অংসে, বাহুতে, বক্ষে পড়িয়াছে ; তার মসৃণ কোমল প্রভার উপর চাদের আলো খেলা করিতেছে ; তাহার সুগন্ধি-চুর্ণ-গন্ধে গগন পরিপূরিত হইয়াছে। এক ছড় o ঘুই ফুলের গড়ে সেই কেশরাজি সংবেষ্টন করিতেছে। ছাদের উপর গালিচ পাতিয়া, সেই বহুরতুমণ্ডিত রূপবতী মূৰ্ত্তিমতী সরস্বতীর স্থায় বীণা বাদনে নিযুক্ত। চন্দ্রের আলোয় জ্যোৎস্নার মত বর্ণ মিশিয়াছে ; তাহার সঙ্গে সেই মৃত্যুমধুর বীণার ধ্বনিও মিশিতেছে—যেমন জলে জলে চন্দ্রের কিরণ খেলিতেছে, যেমন এ সুন্দরীর অলঙ্কারে চাদের আলো খেলিতেছে, এ বন্যকুসুম-মুগন্ধি কৌমুদীক্ষাত বায়ুস্তরসকলে সেই বীণার শব্দ তেমনি খেলিতেছিল। ঝম্ ঝম্ ছন্‌ছন ঝন ঝনন ছন ছন দম দম গ্রিম্ জিম্ বলিয়া বীণে কত কি বাজিতেছিল, তাহা আমি বলিতে পারি না । বীণা কখন কঁাদে, কখন রাগিয়া উঠে, কখন নাচে, কখন আদর করে, কখন গৰ্জিয় উঠে,—বাজিয়ে টিপি টিপি হাসে । ঝি বিট, খাম্বাজ, সিন্ধু—কত মিঠে রাগিণী বাজিল—কেদার, হাম্বীর, বেহাগ—কত গম্ভীর রাগিণী বাজিল