পথের পাচালী ১০ খর! ঠিক সে যাহা চায় তাহাই। অজয় জিজ্ঞাসা করে—তোমাদের বাড়ী কোথায় ভাই?আমাকে একজনের বাড়ী খেতে দিছেছে, বড় বেলায় খেতে দেয়। তোমাদের বাড়ীতে প্রায় কে? খুশিতে অপুর সারা গা কেমন করে, সে বলে-ডাই, আমাদের বাড়ীতে একজন খেতে যায়, সে আজ দেখলাম ঢোলক বাজাচ্চে-তুমি কাল থেকে যেও, আমি এসে ডেকে নিয়ে যাবে।-ঢোলকওয়ালা না হয় তুমি যে বাড়ীতে আগে খেতে, সেখানে খাবে খানিকক্ষণ দু’জনে এদিক-ওদিক বেড়াইবার পর অজয় বলে—আমি যাই ভাই, শেষ সিনে আমার গান আছে—আমার পার্ট কেমন লাগছে তোমার? শেষ রাত্রে যাত্রা ভাঙিলে অপু বাড়ী আসে। পথে আসিতে আসিতে যে যেখানে কথা বলে, তাহার মনে হয় যাত্রার একুটো হইতেছে। বাড়িতে তাহার দিদি বলেও অপু, কেমন যাত্রা শুনলি?••অপুর মনে হয়, গভীর জনশূন্য বনের মধ্যে রাজকুমারী ইন্দুলেখা কি বলিয়া উঠিল। কিসের যে ঘর তাহাকে পাইয়া বসিয়াছে! মহা খুশির সহিত সে বলে-কাল থেকে, অজয় যে সেজেছিল মা, সে আমাদের বাড়ী খেতে আসবে তাহার মা বলে—দুজনে খাবে?-দুজনকে কোখেকেঅপু বলে,—তা না, একগুন তো চ'লে যাবে, শুধু অজয় খাবে দুর্গা বল্পে—কেমন যাত্রা রে অপু?: এমন কক্ষনো দেখিনি—কে মন গান কল্পে যখন সেই রায়ে ম'রে গেল? অপুর তো রাত্রে ঘুমের ঘোরে চারিধারে যেন বোল সঙ্গীত হয়। ভোর হইলে একটু বেলায় তাহার ঘুম ভাঙে-শেষ রাত্রে ঘুমাইয়াছে, তৃপ্তির সঙ্গে ঘুম হয় নাই, সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোয় চোখে যেন দুচ বিধে। চোখে জল দিলে জ্বালা করে। কিন্তু তার কানে একটা বেহালা-ঢোল-মন্দিরার ঐকতান বাজ না তখনও যেন বাজিতেছে—তখনও যেন সে যাত্রার আসরেই বসিয়া আছে। ঘাটের পথে যাইতে পাড়ার মেয়েরা কথা বলিতে বলিতে যাইতেছে, অপূর মনে হইল কেউ ধীরাবতী, কেহ কলিঙ্গদেশের মহারাণী, ফেই রাজপুত্র অজয়ের মা বসুমতী। দিদির প্রতি কথায়, হাতপা নাড়ার ভঙ্গীতে, রাজকন্যা ইন্দুলেখা যেন মাখানো। কাল যে ইন্দুলেখা সাজিয়াছিল তাহাকে মানাইয়াছিল মন্দ নয় বটে, কিন্তু তাহার মনে মনে রাজকন্যা ইন্দুলেখার যে প্রতিমা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহা তাহায় দিদিকে লইয়া, ঐ রকম গায়ের রং, অমনি বড় বড় চোখ, অমন সুন্দর মুখ, অমনি সুন্দর চুল। ইন্দুলেখা তাহার সকল করুণা, স্নেহ, মাধুরী লইয়া কোন্ সেকালের দেশের অতীত জীবনের পরে এবার তাহার দিদি হইয়া যেন ফিরিয়া আসিয়াছে—কাল তাই ইন্দুলেখার কথার ভঙ্গীতে, প্রতি পদক্ষেপে দিদিই যেন ফুটিয়া ফুটিয়া বাহির হইতেছিল। যখন গভীর বনে সে শতম্বেহে ছোট ভাইকে এড়াইয়া রাখিয়াছিল, তাহাকে খাওয়াইবার জন্য ফল আহরণ করিতে গিয়া একা নির্জন বনের মধ্যে হারাইয়া গেল —সেই একদিনের মাকাল ফলের ঘটনাটাই অপুর ক্রমাগত মনে হইতেছিল? দুপুর বেলা খাইবার জন্য অপু গিয়া অজয়কে ডাকিয়া আনিল। তাহার মা দুজনকে এক জায়গায়
পাতা:পথের পাঁচালী.djvu/১৩৯
অবয়ব
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।
পথের পাঁচালী
পথের পাঁচালী