বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:পথের পাঁচালী.djvu/২৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৮
পথের পাঁচালী

 খুকী এথমে ভারি অভিমান করিয়াছিল, কথা কহিবে না, কাছে আসিবে না—নানা কথায় সান্ত্বনা দিবার পর আজকাল ভাব হইয়াছে। বুড়ী ভাইঝির মাথায় আদর করিয়া হাত বুলাইয়া বলে,—বেশ লাল একজোড়া ঢেঁড়ি ঝুম্‌কো হয় তো দিব্যি মানায়, না আজকাল কি উঠেচে—ওগুলোকে বলে কি ছাই—

 শীত আসিল। বুড়ী ও-পাড়ার গাঙ্গুলী-বাড়ী গিয়া বুড়ী রামনাথ গাঙ্গুলী মহাশয়ের কাছে বলিল—ও রাম, জাড় পড়লো বড় আবার—তা গায়ে একখানা বস্তর এমন নেই যে, সকাল সন্দে একটু মুড়িসুড়ি দিয়ে বসি, তা আমায় যদি একাখানা—

 রাম গাঙ্গুলী বলিলেন—আচ্ছা দিদি, একদিন এসো, এ মাসটায় মার হবে না—ও মাসে বরং দেখবো। বহুদিন যাবৎ হাঁটাহাঁটি ঘোরা-ফেরার পর একদিন কুষ্টিয়ার রাঙাছিটের সূতী চাদর একখানা বাহির করিয়া হাতে দিয়া বলিলেন—এই নাও দিদি, ভারি গরম জিনিস—সাড়ে ন' আনা দাম—এর চেয়ে ভাল জিনিস আর নবাবগঞ্জে পাওয়া যায় না- বুধবার এনে রেখেচি—দ্যাখো না খুলে? বুড়ীর তখনও যেন বিশ্বাস হইতেছিল না। আহ্লাদে একগাল হাসিয়া সে সেখানাকে খুলিয়া গায়ে জড়াইয়া বলিল—দিব্যি,—কেমন ওম্‌—মোটাসোটা দিব্যি কাপড়—আঃ দাদা বেঁচে থাকো—কানাই বলাই বেঁচে থাকুক, অক্ষয় প্রমাই হোক—কাঙ্গাল গরিবকে কেউ দেয় না, ওই অন্নদার কাছে একখানা গাছের কাপড় চাচ্চি আজ তিন বছর থেকে—দেব দেব বলে, তা দিলে না—সখটা মিটিয়ে নি, কটা দিনই আর বা?

 সর্ব্বজয়াকে আহ্লা‌দ করিয়া দেখাই সে বলিল,—দ্যাখো ঠাকুরঝি, এ বাড়ী থেকে যে তুমি সাত দোর মেগে বেড়াবে তা হবে না, পষ্ট বলে দিচ্চি। ভিক্ষে মাগতে হয়, আলাদা বন্দোবস্ত করো—

 বুড়ী সে কথা হজম করিয়া লইল। এরূপ অনেক কথাই তাহাকে দিনের মধ্যে দশবার হজম করিতে হয়। সেকালের ছড়াটা সে এখনও ভোলে নাই—

লাথি ঝাঁটা পায়ের তল,
ভাত পাথরটা বুকের বল—

 দুর্গা ভারি খুশী হইয়া বলে, ক'পয়সা দাম পিতিম।—কেমন নাঙা—না? অশ্বাসের সুরে পিসি বলে, আমি মরে গেলে তোকে দিয়ে যাবো, তুই গায়ে দিস্‌ বড় হোলে। নতুন চাদরের সোঁদা সোঁদা মাড়ের গন্ধটা বুড়ীর কাছে ভারি উপাদেয়, ভারি সৌধীন বলিয়া মনে হয়। সকালে চাদরখানা গায়ে জড়াইয়া ঝাঁট দিবার সময় মাঝে মাঝে নিজের দিকে চাহিয়া দেখে। নিষ্প্রয়োজনে ঘাটের পথে দাঁড়াইয়া থাকে, পথ-চলতি নিরীহ ঝি-বউকে ডাকিয়া বলে, কে যায়? রাজীর মা?—এত বেলা যে?—ভূমিকা আরী বেশ দূর না করিয়া একটু হাসিয়া নিজের গায়ের দিকে চাহিয়া বলে, এই গায়ের কাপড়খানা এবার ও-পাড়ার রামচাঁদ—সাড়ে ন' আনা দাম—

 দু'একটা দুষ্ট মেয়ে বলে—উঃ ঠাক্‌'মাকে রাঙা কাপড়ে যা মানিয়েচে! ঠাক্‌'মার বুঝি বিয়ে!