প্রাণের দুয়ার সহসা যেন বন্ধ হইয়া গেছে;—মন যেন আপনার দুই ডানা টানিয়া চুপ করিয়া বসিয়াছে। নিশ্চল মেঘে চন্দ্রতারকা আচ্ছন্ন; নীরব অন্ধকারের মাঝে নিস্তরঙ্গ বায়ুরাশি;—কোনোদিকে সাড়া-শব্দ নাই! মনে হইতেছে এ কোথায় আসিলাম—কোন্ মৃত্যুর দেশে পায়ে-পায়ে অর্দ্ধরাত্রে আমরা এই কয় ক্ষুদ্র প্রাণী! এসময়ে আলোর জন্য, ধ্বনির জন্য, অন্ধকারে কোথাও-একটা-কিছুকে দেখিবার জন্য প্রাণ আকুল হইয়া ওঠে। মন চাহিতেছে চলি, কিন্তু সমস্ত শরীর যেন অসাড় হইয়া গেছে!
লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোটির দিকে দৃষ্টি রাখিয়া, পাল্কীবাহকদের করুণ ক্রন্দন-গান শুনিতে-শুনিতে চলিয়াছি। কোথায় চলিয়াছি, কেমন করিয়া চলিয়াছি, কেনই-বা চলিয়াছি তাহা আর মনে আসিতেছে না;—শুধু বোধ হইতেছে যেন প্রকাণ্ড একটা অন্ধকার গোলকের ভিতর দাঁড়াইয়া, একটি পাও অগ্রসর না হইয়া, আমরা কেবলি তালে-তালে পা ফেলিতেছি—“পহর রাতি, পান বিড়িটি! পান বিড়িটি, পহর রাতি!”
বালুঘাই পার হইয়া চলিয়াছি। পহর রাতি, পান বিড়িটি এবং লণ্ঠনের বাতি, তিনে মিলিয়া মনকে ঘিরিয়া একটা যেন স্বপ্নের সৃজন করিয়াছে। মাঝে-মাঝে এক-একটা তালগাছ অন্ধকারের ভিতর দিয়া হঠাৎ চোখে পড়িয়া আবার কোথায় লুকাইয়া যাইতেছে! চারিদিকে যেন একটা লুকোচুরির খেলা চলিতেছে;—মরীচিকার মায়া দেখা দিতেছে, ঢাকা পড়িতেছে!