কম্পন নাই; তলদেশে— পাতার গুচ্ছে, শাখার গায়ে, আগুনের রং হলুদের প্রলেপের মতো লাগিয়া আছে—অচঞ্চল। আগুনের তপ্তকাঞ্চনবর্ণের সম্মুখে চক্রাকারে সজ্জিত মানুষের ছায়া সুতীক্ষ্ণ, সুস্পষ্ট দেখিতেছি—কিন্তু অবিরল, অবিকল, ছবির মতো।
চণ্ডীদেবীকে দর্শন করিলাম, পাল্কীতে আসিয়া বসিলাম, বাহক আসিল, পাল্কী চলিল—এত গভীর নীরবতার মাঝখানে, যে, মনে হইতে লাগিল, সেই সীমাচলে পৌছিয়াছি যেখানে বাস্তবেঅবাস্তবে স্থূলে সূক্ষ্মে গলাগলি ভাব। নিজেই আছি কি না একথাটা জানিতে চারিদিক হাতড়াইতে-হাতড়াইতে, কাঁটাবনের ঢালু পথ বাহিয়া, পায়ে-পায়ে সন্তর্পণে, একটা অচেনা অন্ধকারের দিকে পুনরায় যখন নামিয়া চলিয়াছি, সেই সময়ে সহসা খোলকরতাল ও সংকীর্ত্তনের প্রচণ্ড শব্দতরঙ্গের ঘাতপ্রতিঘাত বাস্তবকে আনিয়া মনের উপরে এমনি করিয়া আছড়াইয়া ফেলিল, যে, মনে হইল বুক বুঝি ছিঁড়িয়া পড়িল! অন্ধকারে হঠাৎ আলোর আঘাতে দৃষ্টি যেমন সঙ্কুচিত হইয়া যায়, তেমনি সুনিবিড় স্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ একসময়ে এই শব্দতরঙ্গের ঝন্ঝনায় প্রাণের তন্ত্রী বিদ্যুৎবেগে রন্রন্-করিয়াই শিথিল হইয়া পড়ে।
রামচণ্ডী—আমাদের যাত্রাপথের শেষ-ঘাট—পিছনে ফেলিয়া বহুদূরে চলিয়া আসিয়াছি। সেখান হইতে এখানেও কীর্ত্তনের সুর, যেন কোন্ পরিত্যক্ত পার হইতে একটুখানি আক্ষেপের মতো, আমাদের নিকটে পৌঁছিতেছে—অস্পষ্ট, মৃদু, ক্ষণে-ক্ষণে!