বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:পারস্য যাত্রী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৩৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

পারস্য-যাত্রী

প্রাচ্যদেশ। মানুষের বুদ্ধি ইচ্ছাপূর্বক নিজেকে অশ্রদ্ধা ক’রে খর্ব ক’রে রেখেছে, সেইজন্যেই চার দিক থেকেই আমাদের এমন পরাভব, এত অপমান। উজ্জ্বল এঁর মুখশ্রী, বলিষ্ঠ এঁর বাহু, অপ্রতিহত এঁর উত্তম। দেখে আনন্দ হয়; বুঝতে পারি পারস্যকে তার আত্মগত দুর্বলতা থেকে রক্ষা করবার দীপ্যমান ধীশক্তি এঁর। অন্তরের মূঢ়তা বাহিরের শত্রুর সর্বপ্রধান সহায়। তাই আজ যাঁরা পারস্যের ভাগ্যনিয়স্তা তাঁদের সতর্কতা দু দিক থেকেই উদ্যত। হালের মাঝি বাহিরের ঢেউয়ের উপর ঝিঁকে মারছে আবার সংস্কারকর্তা লেগে আছে খোলের ছিদ্র-মেরামতের কাজে। যাঁরা সব চেয়ে দুর্জয় আত্মরিপুকে বশে আনবার ভার নিয়েছেন তাঁদের মধ্যে প্রধান একজন এই তেমুর্তাশ। সেদিন তিনি আমাকে সগর্বে বললেন, ‘পারস্যের ভবিষ্যৎকে সৃষ্টি করবার ভার নিয়েছি আমরা, অর্থাৎ ভূতকালের আঁচল-ধরা হয়ে আমরা ঝিমিয়ে থাকতে চাই নে।’ আমাদের দেশে প্রবাদ আছে, ভূতের পা উল্টো দিকে। আজ এসিয়ার এই পিছন-ফেরা পা আজও যাদের উলটো পথ নির্দেশ করে তাদের মধ্যে সব চেয়ে অধম হচ্ছি আমরা। জাগ্রতবুদ্ধি অবিচলিতসংকল্প এই তেজস্বী পুরুষকে দেখে মনে মনে এঁকে নমস্কার করেছি; বলেছি, ‘তোমাদের মতো মানুষের জন্যেই ভারতবর্ষ অপেক্ষা ক’রে আছে, কেননা চিত্তের স্বাধীনতাই ন্যাশনাল স্বাধীনতার বাহন।’

 তেহেরান থেকে বিদায় নেবার দিন এল। আজ এখানকার রাজসরকার আমাকে জানিয়েছেন শাস্তিনিকেতনে তাঁরা পারসিক বিদ্যার আসন প্রতিষ্ঠা করবেন। এই সুযোগে তাঁদের এই অতিথিকে উপলক্ষ্য ক’রে পারস্যের সঙ্গে ভারতের যোগস্থাপন হবে।

 প্রধান মন্ত্রীবর্গ আজ এসে আমাকে বিদায় দিলেন।

—বিচিত্রা, মাঘ ১৩৩৯, পৃ ২১-২২

১১৮