বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:পারস্য যাত্রী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৩৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

পারস্য-যাত্রী

 ডক্টর ঠাকুরের এই পারস্যপরিদর্শন যেমনি সন্তোষের বিষয় তেমনি গুরুফলগ্রন্থ-কেননা এতে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে পারস্যের বুদ্ধিগত কৃতিত্বের প্রতি উদার ভারতীয়দের কৌতূহল কতখানি, আমাদের মানসিক উৎকর্ষ ও সাহিত্যকে তারা কতখানি সমাদর করে। এই শ্রদ্ধেয় সাধু আজ আমাদের চিরকৃতজ্ঞতাপাশে বাঁধলেন, কেননা অল্পদিনের জন্যে হলেও এমন একজন মহাপুরুষের দীপ্তির কাছাকাছি আসার সৌভাগ্যটা সাধারণ লোকে যতখানি ভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের কবি সাদি এক জায়গায় বলেছেন—

হায় মানুষ! এই জগৎটা শুধু দৈহিক অহং’এর পুষ্টির জন্য নয়;
যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী মানুষের সন্ধান পাওয়া বড়োই কঠিন;
ভোরের পাখির সুরলহরী নিদ্রিত মানুষ জানে না—
মানুষের জগৎটা যে কী, তা পশু কেমন করে জানবে!

তেমনি সাধারণ লোকে না বুঝলেও এটা সত্য যে, ডক্টর ঠাকুরের এই পারস্যেআগমন সেই ভারতীয় জাতিরই মানসিক উৎকর্ষ ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষার নিদর্শন, যে জাতি একটি অপরূপ পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এমন জাতিই তার অতীত গৌরব আর উজ্জ্বলতর ভবিষ্যৎ নিয়ে ন্যায়ত দাবি করতে পারে যে, মানুষের চিন্তাকাশে অত্যুজ্জ্বল তারকারাজির মধ্যে অনেকগুলি তারই, আর জগৎকে সে এক অতি গভীর দর্শনশাস্ত্র দান করেছে।

 নীতিতত্ত্ব ও সৌন্দর্যতত্ত্বের দিক দিয়ে অতি প্রাচীনকাল থেকে এ দেশ ও ভারতবর্ষের মধ্যে একটা নিবিড় অচ্ছেদ্য যোগ রয়েছে। সাসানীয় যুগের প্রাচীনতম সাহিত্যের যে-সব পুঁথি আজ প্রচলিত আছে, তার মধ্যেও পাওয়া যায় এই দুই জাতির পরস্পর আধ্যাত্মিক ভাববিনিময়ের কথা। দেখা যায়, আজকের যুগের মতো প্রাচীন পারস্যবাসীরাও ভারতবর্ষকে সম্ভ্রমের চোখে দেখত, গভীর চিন্তা ও নিগূঢ় তত্ত্বরাজির দেশ হিসেবে। প্রথম সাসানীয় সম্রাট অর্দশির বাবেকানের কার্নামেতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি তাঁর রাজ্য সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্‌বাণী শুনতে চান তখন কোনো ভারতীয় সম্রাটের নিকট

১২০