এত কাছেও হারুর মুখ ঝাপসা হইয়া যায়। তাহার মুখখানা ভাল করিয়া দেখিবার চেষ্টায় ব্যর্থ হইয়া সে যে মরিয়া গিয়াছে এই সত্যটি শশী যেন আবার নূতন করিয়া অভব করে। ভাবে, মরিবার সময় হারু কি ভাবিতেছিল কে জানে! কোন্ কল্পনা কোন্ অনুভূতির মাঝখানে তাহার হঠাৎ ছেদ পড়িয়াছিল?
মেয়ের জন্য পাত্র দেখিতে হারু বাজিতপুরে গিয়াছিল এটা শশী জানিত। পথ সংক্ষেপ করিবার জন্য ওই বিপথে সে পাড়ি জমাইয়াছিল। পথ তাহার সংক্ষিপ্তই হইয়া গেল। পাড়িও জমিল ভালই।
ঘণ্টা দুই পরে গোটা তিনেক লণ্ঠন সঙ্গে করিয়া হারুর সাত-আট জন স্বজাতি আসিয়া পড়িল। নিস্তব্ধ ঘাটটি মুহূর্তে হইয়া উঠিল মুখরিত।
শশী সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, নিতাই এসেছে, নিতাই?
নিতাই সাড়া দিল আজ্ঞে, এই যে আমি ছোটবাবু।
নিতাইয়ের দায়িত্ব জ্ঞান প্রসিদ্ধ। শশী অনেকটা ভরসা পাইল।
হারুর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে নিতাই?
হয়েছে ছোটবাবু।
আলো উঁচু করিয়া ধরিয়া সকলে তাহারা ভিড় করিয়া হারুকে দেখিতে লাগিল। গোবর্ধনের কাছে ব্যাপারটা তাহারা আগাগোঁড়া শুনিয়াছিল। শশীর কাছে আর একবার শুনিল।
তারপর ঘাটের খাঁজের উপর উবু হইয়া বসিয়া আরম্ভ করিয়া দিল জটলা।
কিছুক্ষণের মধ্যে শশীর মনে হইল, হারুর পরলোক-গমন এদের কথার মধ্যেই এতক্ষণে শোচনীয় হইয়া উঠিতেছে। বর্ষণক্ষান্ত বিষণ্ণ রাত্রে কালিপড়া লণ্ঠনের মৃদু রঙীন আলোয় হারুর জীবনের টুকরো-টুকরো ঘটনাগুলি যেন দৃশ্যমান ছায়া-ছবির রূপ গ্রহণ করিয়া চোখের সামনে ভাসিয়া আসিতে লাগিল। হারুর পরিবারের ক্ষতি ও বেদনার প্রকৃতি উপলব্ধি যেন এতক্ষণে শশী আয়ত্ত করিতে পারিল। সে বুঝিতে পারিল, সংসারে হারু যে কতখানি স্থান শূন্য রাখিয়া গিয়াছে—এই অশিক্ষিত মানুরগুলির মনের মাপকাঠি দিয়াই তাহার পরিমাপ সম্ভব। এতক্ষণ হারুর অপমৃত্যুকে সে বুঝিতে পারে নাই। হারুকে সে আপনার জগতে তুলিয়া লইয়াছিল। সেখানে শূন্য করিয়া রাখিয়া যাওয়ার মতো স্থান হারু কোন দিন অধিকার করিয়া ছিল কি না সন্দেহ।
নীরবে শশী অনেকক্ষণ তাহাদের আলোচনা কান পাতিয়া শুনিল। শেষে রাত বাড়িয়া যাইতেছে খেয়াল করিয়া বলিল, তোমরা তাহলে আর বসে থেক না নিতাই। রসিকবাবুর বাগান থেকে বাঁশ কেটে এনে একটা মাচা বেঁধে ফেল।
নিতাই প্রশ্ন করিল, সোজা মশানবিলে নিয়ে যাব কি ছোটবাবু?
৬