বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:প্রকৃতি বনাম মানুষঃ একটি পরিকল্পিত সংঘাত - মাধব গাডগিল.pdf/১২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

ভারতীয় পাখি সম্পর্কে জ্ঞান প্রসারে তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদানের কারণে এবং জনপ্রিয় বই ‘Book of Indian Birds’-এর জন্য আমার বাবার মতো শহুরে শিক্ষিত ও পাখি সম্পর্কে উৎসাহী মানুষেরা তাঁর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। আমার বাবার মতোই, জওহরলাল নেহেরু এবং ইন্দিরা গান্ধী কেমব্রিজ এবং অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেছেন এবং সকলেই পাখি দেখতে খুবই ভালোবাসতেন। তাঁরা সেলিম আলিকে খুবই সম্মান করতেন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে তাঁর উপদেশের উপর নির্ভর করে চলতেন। আমি তাঁর সাহচর্যে বিভিন্ন ফিল্ড ট্রিপে ও জঙ্গলে গিয়ে দেখেছি যে, প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর সখ্যতার বিষয়টা সর্বজনবিদিত হওয়ায় সব আমলারাই তাঁকে মহারাজা জ্ঞান করতেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সহানুভূতিশীল হলেও, তিনি আদৌ গান্ধীর ভারতবর্ষকে গ্রাম স্বরাজের দেশ হিসেবে দেখার ভাবনার সমর্থক বা শরিক ছিলেন না। এই পটভূমি থেকেই বলা যায় তাঁর প্রকৃতি সংরক্ষণের উপদেশগুলি অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট, যার শিকড় রয়েছে একটি কুসংস্কারকে ভিত্তি করে, যা মনে করে যে প্রকৃতির ধ্বংসের একমাত্র কারণ হল সাধারণ জনগণ।

 বন্যপ্রাণের জন্য ভারতীয় বোর্ড

 স্বাধীন ভারতে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের নীতিগুলি আকার নিতে শুরু করে ১৯৫২ সালে বন্যপ্রাণের জন্য বোর্ড গঠনের মধ্যে দিয়ে। এই বোর্ডের সভাপতিত্ব করেছিলেন মাইসোরের মহারাজা এবং সহসভাপতি ছিলেন ভাবনগর রাজপরিবারের ধরম কুমার সিং। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সেলিম আলী এবং দু’জন চা-কফি প্ল্যাণ্টার, আর মরিস এবং ই পি গী। ই পি গী সংরক্ষিত এলাকা তৈরির জন্য সওয়াল করতে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন; যা দু’দশক বাদে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। বন্যপ্রাণ আইনটির খসড়া তৈরি করেছিলেন ওয়াকেনারের রাজ পরিবারের সদস্য এম কে রঞ্জিত সিং। অর্থাৎ, যে মহারাজারা তাদের প্রজাদের সম্পর্কে আদৌ সহানুভূতিশীল ছিলেন না, সমস্ত উদ্যোগটা তারাই নিয়েছিলেন। তারা ব্রিটিশ প্রভুদের ভেট দিতেই অভ্যস্ত ছিলেন। দ্বিতীয়ত ছিলেন ব্রিটিশ চা-কফি এস্টেটের মালিকরা, যারা তাদের কর্মীদের ক্রীতদাসের মতো খাটাতেন।

 ভরতপুরের ভুল

 সেলিম আলীর দৃষ্টান্তস্বরূপ— ভরতপুর জলাভূমি, স্বাধীনতার পর ১৯৫০-এর দশকে তৈরি হওয়া প্রথমদিকের অভয়ারণ্যগুলির মধ্যে অন্যতম। এই জলাভূমি বর্ষাকালে দলে দলে বিপুল সংখ্যার নানারকম পাখির ঝাঁক একসাথে বাসা বাঁধার জন্য এবং শীতে অসংখ্য পরিযায়ী পাখির ঝাঁকের আগমনের জন্য বিখ্যাত। উনি বহু বছর ভরতপুরে কাজ করেছেন, হাজার হাজার পরিযায়ী পাখিদের দলকে প্রত্যক্ষ করেছেন। আমার সৌভাগ্য যে, এইসব ভ্রমণের অনেকগুলিতেই আমি তাঁর সঙ্গী ছিলাম। দিনের শেষে আমরা লম্বা হাঁটা দিতাম। দেখতাম বিশাল বড় বড় মোষের দলেরা ঘরে ফিরছে। সেলিম আলী ওদের দিকে ভীষণ অসন্তুষ্ট চোখে তাকাতেন আর বলতেন, “মাধব, এই বিশ্রী মোষগুলো নিষিদ্ধ হলে এই জলাভূমি পাখিদের জন্য নিরাপদ হবে।” আমি জানতাম, উনি কখনোই এদের কথা তলিয়ে ভাবেননি, এমনকি ভরতপুরের বাস্তুতন্ত্র ঠিক কীভাবে সচল থাকে, তা নিয়েও চর্চা করেননি। ওঁর ঐ মন্তব্যের পটভূমি নিছক কুসংস্কার। তবে, আমিও চুপ করে থেকেছি। ভরতপুর ছিল মোষেদের চারণভূমি।

12