পাতা:প্রবাসী (অষ্টবিংশ ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৫৫৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৪র্থ সংখ্যা]
৫১৯
কষ্টি পাথর—দুর্গা

১৮৩০ খৃষ্টাব্দে গুপ্ত কবির সুপ্রসিদ্ধ সংবাদপত্র “সংবাদ প্রভাকর” প্রকাশিত হয়। এই প্রভাকর হইতেই কবির যশঃপ্রভা চতুর্দ্দিকে বিস্তৃত হইয়া পড়ে। ১৮৩২ খৃষ্টাব্দে “প্রভাকর” বন্ধ হয়। ১৮৩৬ খৃষ্টাব্দে পুনরায় প্রকাশিত হয়। তথন সপ্তাহে তিন দিন “প্রভাকর” প্রকাশিত হইত, পরে ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দ হইতে “প্রভাকর” দৈনিক হইয়া পরে ১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে মাসিকে পরিণত হয়। এই প্রভাকরই তখন বিখ্যাত সংবাদপত্র ছিল। প্রায় শিক্ষিত ভদ্রলোকমাত্রেই ইহার গ্রাহক ছিলেন। তার পর উক্ত গুপ্ত কবি “পাষণ্ড পীড়ন” নামক একখানা সংবাদপত্রও বাহির করেন। ইহা নব প্রচলিত ব্ৰাহ্মধর্ম্মের প্রতিকূলে সনাতন হিন্দুধর্ম্মের স্থিতি-কামনায় কিছুদিন বাগযুদ্ধ করিয়া শেষে নিৰ্ব্বাণ প্রাপ্ত হয়। তদনন্তর “সাধুরঞ্জন” নামে আর একখানি মাসিক পত্র প্রকাশিত হয়। ইহার প্রকাশকও কবি ঈশ্বর গুপ্ত। তিনি বঙ্গ ভাষায় গদ্য ও পদ্যে অনকে গ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছেন। তাঁহার নিকট রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম্ম, সাহিত্য কোনও বিষয় বাদ যাইত না। তিনি সকল বিষয়েই লেখনী চালনা করিতেন।

 এক্ষণে আমাদের নির্দ্দিষ্ট পথে আর চারিজন গ্রন্থকারের ও গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করিয়া বর্ত্তমান প্রবন্ধের উপসংহার করিব। প্রথম রঘুনন্দন গোস্বামী; ইনি রামচরিত্রাবলম্বনে “রামরসায়ন” নামক অতি সুন্দর একখানি পদ্যগ্রন্থ রচনা করেন। তার পর কৃষ্ণকমল গোস্বামীর স্বপ্নবিলাস, বিচিত্রবিলাসরাই উন্মাদিনী গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়া বাঙ্গলা সাহিত্যভাণ্ডারের অঙ্গ পুষ্ট করে। রাধামোহন সেন মহাশয়ও “সঙ্গীত তরঙ্গ” প্রকাশিত করিয়া এই সময় বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। কিন্তু সর্ব্বাপেক্ষা অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন, কাদম্বরীর অনুবাদক পণ্ডিত তারাশঙ্কর তর্করত্ন। তারাশঙ্করের কাদম্বরীর ভাষা দিব্য প্রাঞ্জল ও শ্রুতিসুখকর। তৎকালে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের লিখিত বাঙ্গলা একরূপ অবোধ্যই ছিল। তাহার উদাহরণ প্ৰবোধচন্দ্রিকা প্রভৃতি। কিন্তু তারাশঙ্কর, কাদম্বরীর অনুবাদে সংস্কৃতমূলক বাঙ্গলা যে কিরূপ সুন্দর করা যাইতে পারে তাহার পথ দেখাইয়াছেন। পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই পথানুসরণে বঙ্গভাষাকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর ও শ্রীসম্পন্ন করেন।

 কাদম্বরীর ভাষাঃ—“… সখে ক্ষণকাল অপেক্ষা কর, আমি তোমার অনুগমন করি। চিরকাল একত্র ছিলাম, এক্ষণে সহায়হীন, বান্ধবহীন হইয়া কিরূপে এই দেহভার বহন করি। কি আশ্চর্য্য! আজন্ম পরিচিত ব্যক্তিকেও অপরিচিতের ন্যায় অদৃষ্টপূর্ব্বের ন্যায়, পরিত্যাগ করিয়া গেলে?” উক্ত তর্করত্ন মহাশয় “রাসেলাস” নামক একখানি ইংরাজী গ্রন্থের অনুবাদ করিয়া প্রকাশ করেন। তাহার ভাষাঃ—“বৃদ্ধ এইরূপ আহ্বানে উৎসাহিত হইয়া রাজকুমারের মনোগত ভাবের পরিবর্ত্তের কথা উল্লেখ করিয়া দুঃখ করিতে লাগিলেন ও জিজ্ঞাসিলেন ‘কুমার! তুমি কি নিমিত্ত প্রাসাদের সুখসম্ভোগ ও আমোদ-প্রমোদ পরিত্যাগ করিয়া সর্ব্বদা নির্জ্জনে অবস্থিতি কর ও লোকের সহিত কথাবার্ত্তা না কহিয়া মৌনভাবে থাক?” এই যে তারাশঙ্কর বাঙ্গলা ভাষাকে নূতন প্রাণে অনুপ্রাণিত করিলেন তাহার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার প্রভৃতি মাতৃভাষাকে সর্ব্বপ্রকারেই নূতনভাবে সঞ্জীবিত করিয়া তুলিতে লাগিলেন।

(অর্চ্চনা, পৌষ, ১৩৩৫)
শ্রী শরচ্চন্দ্র কাব্যতীর্থ
 
 

 

দূর্গা

 দুর্গাপূজা শারদীয়া পূজা। এই মহাপূজা শরৎ ঋতুতেই হয়। আজকাল শরৎকাল বলিলে ভাদ্র আশ্বিন মাস বুঝায়; পূর্ব্বে কিন্তু আশ্বিন ও কার্ত্তিক বুঝাইত। এই পূজা বাঙলা দেশের সকলের চেয়ে বড় পূজা; ইহার চেয়ে বড় পূজা বাঙলায় নাই—ভারতে নাই। কোন কোন দেশের এই পূজাকে নবপত্রিকার পূজা বলে। নেপালে নবপত্রিকার উৎসব হয়। এই পূজা করিবার সময় কদলী, দাড়িম, ধান্য, হরিদ্রা, মান, কচু, বিল্ব, অশোক ও জয়ন্তী, এই নয়টী গাছ একত্র করিয়া তাহার উপর পূজা করিতে হয়। এ পূজায় কোন প্রতিমা থাকিবার ব্যবস্থা নাই।

 আমাদের দেশে দেবীপূজা দুইরূপ—বাসন্তীপূজা পূজার একরূপ, অপর রূপে ইহা দুর্গা পূজা। বাসন্তীপূজা করিবার নিয়ম, এক, দুই বা তিন দিন; আর দুর্গাপূজার বিধি একদিন হইতে আরম্ভ করিয়া একপক্ষ পৰ্য্যন্ত। সাধারণতঃ বাসন্তীপূজা তিন দিনের পূজা। কালিকাপুরাণে অষ্টমীকল্পের আর দুর্গোৎসব বিবেকে নবমীকল্পের বিধি আছে। ইহাদের মতে এই পূজা দুইদিন বা একদিন করা চলে। পূজাতে চণ্ডীপাঠও আছে। ষষ্ঠীতে সায়ংকালে বিল্ববৃক্ষ-মূলে ‘আমন্ত্রণ’ ও প্রতিমার ‘অধিবাস’ করিয়া থাকিতে হয়, পরদিন সপ্তমীতে আমন্ত্রিত বিল্বশাখা কাটিয়া যথাবিধানে পূজা করিতে হয়। বাসন্তীপূজার প্রবর্ত্তনকাল সম্বন্ধে ব্ৰহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ (প্রকৃতি থণ্ড, ৬২ অধ্যায়) বলেন প্রথমে কৃষ্ণ গোলোকে রাসমণ্ডলে মধুমাসে (চৈত্রমাসে) দুর্গাদেবীর পূজা করেন। দ্বিতীয় বারে ব্ৰহ্মা বিষ্ণুর সঙ্গে মধুকৈটভের যুদ্ধের সময়ে প্রাণ-সঙ্কটকালে দেবীপূজা করেন। বসন্তের ও শরতের পূজার পার্থক্য আছে। বাসন্তীকে কালোচিত পূজা বলে, শারদীয়া পূজাকে অকাল পূজা বলে, এইটুকুই প্রধান ভেদ। অকাল বলিলে আমরা বুঝি কি? সৌর বর্ষের মকর সংক্রান্তি হইতে ৬ মাস অর্থাৎ মাঘ হইতে আষাঢ় পর্য্যন্ত উত্তরায়ণ; কর্কট সংক্রান্তি হইতে ৬ মাস অর্থাৎ শ্রাবণ হইতে পৌষ পর্য্যন্ত দক্ষিণায়ণ। শাস্ত্রের বিধি অনুসারে এক অয়নে দেবতারা জাগ্রত থাকেন অপর অয়নে নিদ্রিত। যখন তাঁহারা জাগ্রত তখন “কাল”, যখন নিদ্রিত তখন “অকাল”। উত্তরায়ণে দেবতারা জাগ্রত এবং দক্ষিণায়নে নিদ্রিত, তাই—উত্তরায়ণের বাসন্তী কালের পূজা, আর দক্ষিণায়নের শারদীয়া অকালের পূজা। আর অকালের পূজা বলিয়াই এই পূজার এত আদর। অকালে দেবতাদের নিদ্রা, কাজেই দেবীকে জাগাইতে হয়; সেই জন্যই বোধনের ব্যবস্থা। শারদীয়া পূজার শুধু আমন্ত্রণ ও অধিবাস কারলেই চলে না, এ পূজায় বোধন করিতে হয়। আর এই বোধনই এই পূজায় প্রধান ও বিশেষ কার্য্য।

 আমরা যে দুর্গাপূজা করিয়া থাকি সেই দেবীর মূর্ত্তি সম্বন্ধে দু’এক কথা বলা দরকার। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক ও গণেশ মূর্ত্তি সংযুক্ত দুর্গাপূজার ধ্যান করিবার নিয়ম আছে । কিন্তু এইরূপ একত্র সংযুক্ত মূর্ত্তির বর্ণনা একটা স্থান ব্যতীত আর কোথাও পাওয়া যায় না। একমাত্র কালীবিলাস তন্ত্রে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক, গণেশ সুর ও সিংহ সমন্বিত দুর্গাদেবীর আরাধনার কথা আছে। ইহারই বচন অবলম্বন করিয়া আমাদের দেশে পূজা করিতে হয়।…

 দেবীর রূপ—মাথায় জটা, অর্দ্ধচন্দ্রের মুকুট, তিনটী চক্ষু, মুখ পূর্ণচন্দ্রের মত, দেহের আভা তপ্তকাঞ্চনের তুল্য, দাঁড়াইবার ভঙ্গী বেশ সুন্দর—তাঁহার দেহ—নবযৌবনসম্পন্ন, সর্ব্বাভরণভূষিত, দন্ত—-