পাতা:প্রবাসী (ঊনত্রিংশ ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৮২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


억 e প্রবাসী—চৈত্র, ১৩৩৬ [ ২৯শ ভাগ, ২য় খণ্ড সে বলিয়া চলিল, “সবাই আবার স্কুল-কলেজে ঢুকে দিন কিনছে, বাবু যে বখাটে সে বখাটেই রয়ে গেলেন । দুবেলা ভাত জুটলে পাড়ায় পাড়ায় আডডা মেরে বেড়াতে ভাল আর লাগে না কার? অত বড় জোয়ান ছেলে একটি পয়সা রোজগার করবার ক্ষমতা নেই। আমি হ’লে দেশসেবার স্তাকামি না করে গলায় দড়ি দিতাম।” দাত দিয়া ঠোট চাপিয়া ধরিয়া মাধবী নিঃশব্দে থোকার জামা সেলাই করিতেছিল, শিবপদর মুগের দিকে চাহিয়া তার কান্না পাইল । বলিল, “তুমি যাও তে, মুখহাত ধুয়ে আসবে। রোজগার করবার বয়সটা ঠাকুরপোর কি এমন গিয়েছে শুনি ?” রমাপদ আর কথা না কহিয়া উঠিয়া বাহিরে চলিয়া গেল। শিবপদ পাষাণের মূর্ডির মত স্তন্ধ হইয়া দাড়াইয় রহিল। তীব্র অভিমান তার নয়নের অন্তরালে যে বর্মণোদ্যত মেঘের সৃষ্টি করিয়াছিল, অশ্রবর্ধণ হইতে তাহাদের নিবৃত্ত করিয়া রাথিতেই তার সবটুকু শক্তি ব্যয়িত হইতে লাগিল । পরদিন সকালে সে বাহির হইল না। দশটার সময় রমাপদর সঙ্গে আপিসে চলিয়া গেল । Φ. অক্ষমতার সাত্বনা আছে, আশক্তের কৈফিয়ং আছে । শ-পারার বেদনা তাদের এই আত্মগ্নানিতে অসহ হইয়া ওঠে না যে, শক্তি থাকিতেও কিছু করিতে পারিল না। সক্ষমের সে সাম্বনা নাই। তীক্ষ্ণ অনুভূতিতে জীবনের সত্য যাচাই হইয়া গিয়া পথ এবং লক্ষ্য যার স্থির হইয়া গেল, সেই পথ ধরিয়া লক্ষ্যের পানে আগাইয়া যাইবার শক্তির সন্ধান যে নিজের ভিতরে আবিষ্কার করিল, নিজে নিজের হাত পা বাধিয়া গতিবেগ বিসর্জন দিতে হইলে তার দুঃখ যেন সীমা ছাড়াইয়া যায়। দশটা হইতে পাচটা অবধি শিবপদ কলম পেষে, মাসান্তে পয়তাল্লিশটি টাকা আনিয়া মাধবীর হাতে দেয়। আর ভাবে, মাসিক পয়তাল্লিশটি টাকার ঋণে সংসার তাকে কিনিয়া লইয়াছে ! লজ্জা, লজা ! শোচনীয় লজ্জার কথা তার। নিবারণের সঙ্গে পথে দেখা হয়, ডান কাধের খঙ্গর বা কাধে সরাইয়া অর্থযুক্ত হাসি হাসিয়া নিবারণ বলে, ”খঙ্গর কিনবেন স্যার ? ভাল খন্দর।” বন্ধুর পরিহাস। বিষয়াত কাটার মত সে পরিহাস কি মৰ্ম্মাম্ভিকভাবে শিবপদর অস্তুরে বিধিয়া জালা ধরাইয়া দেয় বন্ধু তা বোঝে না । হরেনবাবু, দূর হইতে দেখিতে পাইলেই হাকাস্থাকি মুরু করেন, "ওহে শিবপদ, শোন শোন।” কাছে গেলে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেন। বলেন, “একেবারে সাহেবের গোলামী ! না হয় একটা দোকান-টোকানই খুলতে হে!" শিবপদ নিঃশব্দে তার সহানুভূতির চাবুক সহ্য করে। তর্ক করে না, লাভ নাই বলিয়া । ধনী দেশসেবক যে তার কথা কিছুতেই বুঝিতে পরিবেন না, সে জানে। মোটরে দুই টাকার তেল খরচ করিয়া যিনি খন্ধর বিক্রির আট আনা লাভ জমা দিয়া নাম কেনেন এবং আত্মপ্রসাদ অহুভব করেন, শিবপদর কথা বুঝিবার মত করিয়া বিধাতা তার মনকে গড়েন নাই । নাইট স্কুলে পড়াইতে যায়। বন্ধুদের আলোচনা কানে আসে—মাস দুই, বড়-জোর আর মাস দুই ! বিয়ের ফুলটি ফুটবে, দেশসেবার ফুলটি বোটামৃদ্ধ করবে। কি গৰ্ব্বই ছিল ছেলের ! মাথা নীচু করিয়া শিবপদ পথে নামিয়া আসে, সেদিন আর পড়ান হয় না। আর সেই কামাই করা বন্ধুদের সিদ্ধাস্তকে চমৎকার সমর্থন করে ! এমনিভাবে দিন যায়। । পৌষ মাস। আপিসের ভিতর দিনের আলো অতি মানভাবে প্রবেশ করে, ঢুকিলেই মন কেমন দমিয়া যায়। সারাদিন সেই শীর্ণ রোগীর হাসির মত দীপ্তিহীন আলোতে কাজ করিতে করিতে শিবপদর মনে হয় সে যেন রূপকথার নিদ্রাপুরীতে আসিয়া পড়িয়াছে। রাস্তার গাড়ীঘোড়ার শব্দ অতি ক্ষীণভাবে কানে আসে, নিস্তব্ধ আপিসঘরে সহকৰ্ম্মীদের কলম চালানোর একটানা মৃদ্ধ খস খস শব্দ ওঠে। উদাস বৈরাগ্যে শিবপৃদর অন্তর ভরিয়া যায়।