পাতা:প্রবাসী (ঊনত্রিংশ ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৮২৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৬ষ্ঠ সংখ্যা ] চাপা আগুন ፃፃ » বাহিরের লক্ষ মানুষের জীবন-প্রবাহের যে উন্মত্ত কলরোল হইতে মাত্র ঘণ্টাকয়েক পূৰ্ব্বে সে এখানে ঢুকিয়াছে, তাহা যেন সহসা কল্পনার বন্ধ হইয়া যায়। সত্য হইয়া থাকে শুধু কলম-চালানো । উচ্ছ্বাস নাই, উদ্বেগ নাই, চিন্তার ঘাতপ্রতিঘাতের বালাই নাই, আত্মবিশ্লেষণের প্রচেষ্টা নাই, যন্ত্রের মত শুধু লিখিয় যাওয়া ছাড়া জীবনের যেন আর কোনো অর্থও নাই । মন্দ লাগে না । দুঃখ-যন্ত্রণ পৰ্য্যস্ত যেন বৈরাগ্যের মোহগ্ৰস্ত হইয়া সমাধি পায়। পাচটার পর বাহিরে আসে। দেখে, শীতের অপরান্ধের সূৰ্য্যালোক পরিমান হইয়া গিয়াছে। দেখিয়া মন তার আরও দমিয়া যায়। ক্লাস্তি আর বিষণ্ণতা তার চোখে যেন ঘষা কাচের চশমা পরাইয়া দেয়, জীবনকে মনে হয় মলিন এবং নিম্প্রভ । জনস্রোতের ব্যস্ততা তাকে যেন ব্যঙ্গ করে। ধীরে ধীরে সে চলিতে আরম্ভ করে। কোনো কোনো দিন বাড়ী পর্য্যস্ত ঠাটিয় যাওয়ার চিন্তাটা অসহ্য মনে হয়। ট্রামে চাপিয়া বসে। টিকিটের পয়সা গুণিয় দিবার সময় এই কথা ভাবিয়া তার মুখে জালাভরা হাসি ফুটিয় উঠে যে, একদিন ক্ষুধার জালা পৰ্য্যন্ত তাকে দিয়া জলখাবারের কটা পয়সা ব্যয় করাইতে পারে নাই। যেদিন হাটিয়া বাড়ী ফেরে প্রথমটা ঝিমাইতে ঝিমাইতে মন্থরপদে চলে। তারপর ঠাটিতে স্থাটিতে তার বহুক্ষণের নিক্রিয় আড়ষ্ট দেহযন্ত্ৰ সতেজ হুইয়া উঠে। গতিবেগ বাড়িতে বাড়িতে তার স্বাভাবিক অতি-দ্ৰুত চলায় পরিণত হয়। ওইটুকু পরিশ্রমেই তার দেহমনের ম্যাজমেজে ভাবটা অনেকখানি কাটিয়া যায়। সেদিন স্থাটিয়াই ফিরিতেছিল ধৰ্ম্মতলা দিয়া । ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছাকাছি পৌছিয়াছে, পিছন দিক হইতে একটি দামী মোটরকার তাকে ছাড়াইয়া একটু জাগাইয়া গিয়াই ব্রেক কবিয়া থামিয়া গেল। পিছনের সিটে হেলান দিয়া বসিয়াছিল এক তরুণী, সোজা হইয়া বসিয়া ডাকিল,-“শিবপদ !” শিবপদ নিজের চিন্তায় বিভোর হইয়া অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পথ চলিতেছিল, থমকিয়া দাড়াইল। মুখ ফিরাইয়া আরোহিণীকে দেখিয়া সে চমকিয়া উঠিল। তরুণী বলিল, “অনেকদিন পরে দেখা হ'ল।" শিবপদ বলিল, “হ্যা।” "শুধু স্থা বয়ে, আর কোনো কথা খুজে পেলে না ?” “অরি কি বলব নীতি ?” নীতি হাসিল, “একটু উচ্ছ্বাস । আমায় দেখে যে ভয়ানক খুশী হয়েছ তার একটুখানি প্রকাশ ! না, খুশী হওনি ?” শিবপদ বলিল, “কি যে বল ; খুশী হয়েছি বৈকি। কেমন আছ ?” “তবু ভাল, এতক্ষণে ভদ্রত-জ্ঞানটা দেখা দিয়েছে। ভালই আছি । মোটা হয়েছি মনে হচ্ছে না তোমার ?” ঠিক উল্টাটাই শিবপদর মনে হইতেছিল। নীতি রোগ হইয়া গিয়াছে। ছয় মাস পূৰ্ব্বে শ্রাবণের এক নিরবচ্ছিন্ন বর্ষণব্যাকুল দিনে শেষবার নীতিকে সে দেখিয়ছিল বর্ধার তটিনীর মতই স্বাস্থ্যসম্পদে পরিপূর্ণ, ছয় মাস পরে শীতের স্বল্পায়ু দিনের শেষে আজ নীতিকে দেখিল, শীর্ণ এবং স্নান । হাস্তদীপ্ত যে আননে অস্তরের আনন্দআলোকের ছটা দেখিয়া একদিন সে অভ্যস্ত খুনী হইয়া উঠিত, বিষাদ ও ক্লিষ্টতার পাণ্ডুর ছায়া সে আরন. ঘেরিয়া রহিয়াছে । শিবপদ অত্যস্ত বেদন অঙ্গভব করিল। নীতির শেষ প্রশ্নটার জবাব সে দিল না, দিতে পারিল না। আর একটা প্রশ্ন করিল, “তোমার বাবা :ভাল আছেন নীতি ?” "ষ্ট্যা । এদিকে কোথায় গিয়েছিলে ?” শিবপদ সংক্ষেপে বলিল, “আপিসে !” নীতি আশ্চৰ্য্য হইয়া বলিল, “আপিস । তার মানে ?” “মানে খুব সোজ, চাকরী করছি।” নীতির মুখ মান হুইয়া গেল। ধীরে ধীরে বলিল, “বিশ্বাস করা শক্ত ঠেকছে, কিন্তু পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কোনো জিনিষ নেই। ঠাট্টা করছ না তো ? সত্যি ?” শিবপদ একটুখানি হাসিল। কথার চেয়ে সে-হাসি স্পষ্ট করিয়া জানাইয়া দিল ইহা ঠাট্ট নয়, সত্য । নীতি বলিল, “কিসে এটা সম্ভব হ’ল ?”