পাতা:প্রবাসী (পঞ্চম ভাগ).djvu/২৬১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পরীক্ষায় ঠিক এইরূপ ব্যবস্থা আছে, 8trr তাহাও পূৰ্ব্বোল্লিখিত প্রবন্ধে দেখাইয়াছি । আমরা পরে অনুসন্ধানে জানিয়াছি যে, ভারতীয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও অপরাপর প্রাচ্য ভাষায়ও এই সঙ্গত ব্যবস্থাই আছে। কেবলমাত্র কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুৰ্ব্বোক্ত অদ্ভুত ব্যবস্থা বর্তমান । কেন না বাঙ্গালী অতিবুদ্ধিমান! ইহাও বলিয়া রাখি, ব্যবস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি অবধি ছিল না, ইংরাজী হইতে মাতৃভাষায় অনুবাদ ১৮৭৪ সালে এবং মাতৃভাষায় প্রবন্ধ রচনা ১৮৮৭ সালে প্ৰবৰ্ত্তিত হইয়াছে। শুনিয়াছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ সদস্তগধ বলেন যে র্তাহারা এই উপায়ে প্রাচীনভাষা ও মাতৃভাষা এতদুভয়েরই চর্চার অবসর দিয়াছেন। অবশু তজ্জন্ত তাহদের উপস্থিতবুদ্ধির ও উভয়ভাষানুরাগের ভূয়সী প্রশংসা করা উচিত। কিন্তু এই রফাবন্দোবস্তের ধরণ যে প্রকৃতরূপে সংস্কৃত শিক্ষার দফা রফা করা হইল, একথাটা একজন সাহেব বুঝেন কিন্তু ইহারা বুঝেন না। তাহারা যদি এই সদিচ্ছাপ্রণোদিত হইয়াই উল্লিখিত ব্যবস্থা চালাইয়া থাকেন, তাহা হইলে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক প্রশ্নপত্রে স্বতন্ত্র পাশের ব্যবস্থা করিলেই ত এই অনর্থ ঘটিত না, অর্থাৎ সংস্কৃত না জানিয়া কেহ সংস্কৃতে পাশ হইত না । এই বুদ্ধিটুকু বিশ্বপণ্ডিতগণের ঘটে আসে নাই, ইহা কি কম পরিতাপের দিষয়! কোন কথায় কোন কথা আসিয়া পড়িল যাহা হউক, ফুলার সাহেব যে দোষের কথা তুলিয়াছেন তাহ নিবারণ করিয়া প্রকৃষ্ট প্রণালীর প্রবর্তন করাই সংযুক্তি, তজ্জন্ত সংস্কৃত শিক্ষার মুলোচ্ছেদ করা বিধেয় নহে। এ পর্য্যস্ত ফুলার সাহেবের যুক্তিগুলির খণ্ডন করিলাম। এক্ষণে সংস্কৃত শিক্ষার সপক্ষে কয়েকটি যুক্তির অবতারণা করিয়া প্রবন্ধ শেষ করিব । আমাদের প্রথম কথা । বিশ্ববিদ্যালয়ে নানাবিষয় শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত আছে, তন্মধ্যে ভাষাশিক্ষাও অন্যতম । কয়টি ভাষা ও কোন কোন ভাষা শিক্ষা দেওয়া উচিত ইহাই এক্ষণে বিচাৰ্য্য। স্মরণ য়াথিতে হইবে যে ভারতবর্ষীয় সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ইংরাজী ভাষায় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ; ইংরাজী ভাষার সাহায্যে শিক্ষাদান ও পরীক্ষাগ্রহণ এবং প্রবাসী । ভাববাক্তি হইবে ইহাই ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকালেই છફે মূল নিয়ম ( principle ) বিধিবদ্ধ হইয়াছিল। দ্বিতীয় ভাষার পরীক্ষাগ্রহণকালে কোনও কোনও স্থলে এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হয়, সেটা সামান্তবিধি নহে, বিশেষ বিধি। যে সকল মাতৃভাষানুরাগী সদস্তগণ ইতিহাস,ভূগোল,অঙ্কশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়েও মাতৃভাষার সাহায্যে পরীক্ষাধানের ব্যবস্থা করিতে চাহেন,তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়স্থাপনকালের মূল নিয়মটি বিশ্বত হয়েন ইহা বড় আক্ষেপের বিষয়। ইহা ছাড়া দেশকাল বিবেচনায় অস্ত কারণেও ইংরাজী ভাষা শিক্ষা আমাদের অপরিহার্য্য। অতএব শিক্ষা ও পরীক্ষার বিষয়ের মধ্যে ইংরাজী ভাষা সৰ্ব্বাগ্রে স্থানলাভ করিবে ইহা বোধ করি সৰ্ব্ববাদসম্মত । ইহা ছাড়া আর কোনূ ভাষা শিক্ষা করা উচিত ? মাতৃভাষা ও প্রাচীন ভাষা উভয়ই প্রয়োজনীয় স্বীকার করি। যদি উভয়েরই স্থান করা যায় তাহ হইলে ত লেঠা চুকিয়াই যায়, কোনও পক্ষের সহিত বাদবিসংবাদ ঘটে না। কিন্তু তিনটি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করিলে শিক্ষিতব্য অন্যান্ত বিষয়গুলির উপর অন্তীয় করা হয়, এবং ভাষা শিক্ষার উপর অযথা ক্টোক দেওয়া হয় । সুতরাং ওরূপ ব্যবস্থা অন্তান্ত বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণের অপ্রতিকর হইবে এবং উহা শিক্ষানীতি সম্মতও নহে। অগত্য ইংল্পাঞ্জীর উপর জোর আর একটি ভাষা দ্বিতীয় ভাষা ( Second Language ) স্বরূপ গৃহীত হইতে পারে। সেট মাতৃভাষা হইবে কি প্রাচীনভাষা হুইবে ইহা লইয়াই বিতণ্ড উপস্থিত। প্রবেশিকা পরীক্ষার পরে প্রাচীন ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থা করিলে বড় অসুবিধা ঘটবে। কেন না এ সকল ভাষার শব্দরূপ ও ধাতুরূপ এক বিরাটু ব্যাপার। ইহা আয়ত্ত্ব করিতে প্রবল স্মৃতিশক্তির প্রয়োজন। আজকাল ছাত্রের "প্রাপ্তে তু ষোড়শে বর্ষে প্রবেশিক পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পাইবে। তাহার পর প্রাচীন ভাষাশিক্ষা করিতে যাওয়া বিড়ম্বন। আমাদের বিবেচনার প্রাচীন ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চনীচ সকল Arts পরীক্ষায় অবশুশিক্ষণীয় হওয়া উচিত, মাতৃভাষায় সাক্ষাৎ সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নাই। কেন, তাহাও বলি। স্কুলের নিম্নশ্রেণীতে মাতৃভাষা রীতিমত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে । হালে বিষয়শিক্ষাও মাতৃভাষার সাহায্যে দেওয়ার ব্যবস্থা হওয়াতে মাতৃভাষাজ্ঞান আরওঁ ৫ম ভাগ । ৮ম সংখ্যা । ] পাক হইবে । এ অবস্থায় স্কুলের উচ্চশ্রেণীতে সংস্কৃত শিক্ষা দিলে মাতৃভাষাজ্ঞানের কোনও ব্যাঘাত ঘটবে না। উপরন্তু ইহাতে মাতৃভাষা জ্ঞানের যথেষ্ট সহায়তা করিবে। কেন না বাঙ্গল, হিন্দী, যার্থটি, উড়িয়া প্রভৃতি ভাষার সংস্কৃত ভাষায় সহিত এবং উর্দু ভাষার আরবী ও পার্শীর সহিত এত নিকট সম্বন্ধ যে ঐ সকল প্রাচীন ভাষা অধ্যয়ন করিলে মাতৃভাষায় সাধুভাষার রীতিশিক্ষার স্বযোগ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে, মাতৃভাষা শিক্ষা করিলে সংস্কৃত, আরবী, পাশ প্রভৃতি প্রাচীন ভাষার ব্যাকরণ ও প্রয়োগরীতি আয়ত্ব করিবার কোনও সুবিধা পাওয়া যায় না। ফুলার সাহেব মাতৃভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখাইয়াছেন, কিন্তু প্রাচীনভাষা শিক্ষা ব্যতিরেকে সেই উদ্দেশু যে সম্যকৃরূপে সিদ্ধ হইতে পারে না একথাটা দেখিয়াও দেখেন নাই । ষ্টছ ছাড়া প্রাচীনভাষাশিক্ষায় কতকগুলি মনোবৃত্তির অমুশীলন হয় এবং প্রাচীন সভ্যতা সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ হয়, মাতৃভাষা-শিক্ষায় সে উপকারিত আীে নাই। এদিকৃ হইতে দেখিতে হইলে প্রাচীনভাষা ও মাতৃভাষা এতদুভয়ের মধ্যে তুলনাই হয় না। আমাদের দ্বিতীয় কথা। ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ব্যবস্থা করিতে হইলে অনেক দিক দেখিতে হয়। ভারতবর্ষে (ব্ৰহ্মদেশ ও সিংহলদ্বীপও ষ্টচার অস্তভুক্ত! ) নানাজাতি নানাধৰ্ম্ম ও নানাভাষার সমাবেশ। এক্ষেত্রে ছাত্রদিগের মাতৃভাষা পরীক্ষাতালিকাভূক্ত করিতে হইলে অসংখ্য ভাষার দাবী গ্রাহ করিতে হয়, তজ্জন্ত নানা বন্দোবস্ত করিতে হয়। ফলে ধাড়াইয়াছেও তাঁহাই। যখন যে সম্প্রদায় স্বকীয় ভাষার তরফ হইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট আবৃন্ত্রী পেণ করিয়াছেন, তখনই বিশ্ববিদ্যালয় উদারভাবে সেই প্রার্থনা মধুর করিয়াছেন। আমাদের বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় সমদৰ্শিতা দেখাইতে গিয়া এমন সকল ভাষা প্রবেশিক পূীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট করিয়াছেন যাহাদিগের এরূপ উচ্চসাহিত্য নাই যে তাহ প্রবেশিকাশ্রেণীতে পঠিত হইতে পারে বতাহ বাঙ্গল, হিন্দী প্রভৃতি ভাষায় সাহিত্যের সঙ্গে সমান আসন অধিকার করিতে পারে। হিন্দুদিগের প্রাচীনভাষা সংস্কৃত, বৌদ্ধদ্বগের প্রাচীনভাষা পালি, মুসলমানদিগের প্রাচীনভাষী আরবী ও পাণী, য়িহদীদিগের প্রাচীনভাষা হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতশিক্ষা সম্বন্ধে ফুলার সাহেবের মন্তব্য। 8ե-Ֆ এবং যুরোপীয়দিগের প্রাচীনতা ল্যাটন ও গ্ৰীৰ এই ছর সাতটি ভাষা দ্বিতীয় ভাষা স্বরূপ নির্দেশ করিলে ভাষাবিভ্রাটের এই বহাড়ম্বর অনায়াসে পরিহার করা যাইত । এবং ইহাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্য্যভারও অনেক পরিমাণে লঘু ইষ্টত। একথাটা কি ভাবিবার বিষয় নছে ? আসল কথা, ফুলার সাহেব তাহার শাসনাধীন প্রদেশের অধিবাসী পাৰ্ব্বতীয় ও খসিভাষাভাষী ছাত্রদিগের ধরদ বুঝিয়াই প্রাচীন ভাষা সম্বন্ধে এরূপ ব্যবস্থা করিতে চাহেন, কেন না বর্তমান ব্যবস্থায় প্রবেশিক পরীক্ষায় তাছাদের মাতৃভাষার স্থান থাকিলেও উচ্চতর পরীক্ষায় নাই, কাজেই উচ্চশিক্ষাভিলাষী ছাত্রদিগকে বাধ্য হইয়া গোড়া হইতে ল্যাটিন ভাষার শস্বরূপ ও ধাতুরূপ মুখস্থ করিতে হয়। আহ, ইহাদের অবস্থা শোচনীয় সন্দেহ নাই; সংস্কৃত, পালি, আরবী, পাণী, হিক্ত এই সকল প্রাচ্য ভাষার কোনওটিই ইহাদিগের পূৰ্ব্বপুরুষদিগের প্রাচীন ভাষা নহে। কিন্তু মনস্বী ব্যক্তিমাত্রেই স্বীকার করিবেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ বিশুদ্ধ ও উচ্চ থাকা উচিত, তাহাতে দি অহয়ত জাতির অস্থবিধ ঘটে তজ্জন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ থাটাে করা কোনও মতেই বিধেয় নহে। অমুল্লভ জাতি ধদি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের উচ্চ অধিকারপ্রার্থ হয়, তাহা হইলে তাহাদিগকে সেই উচ্চ আদর্শের অনুযায়ী শিক্ষালাভের জন্ত প্ৰযত্নশীল হইতে হইবে । বিশ্ববিদ্যালয় কখনই তাহদিগের নগণ্য ভাষা ও সাহিত্যকে প্রশ্ৰয় দিয়া নিজের উচ্চ মাথা হেঁট করিবেন না । আমরা এপর্য্যন্ত কেবল তর্কই করিলাম। প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত ও অপরাপর প্রাচীন ভাষাশিক্ষার কি কি উপকারিত তাহা গত চৈত্র মাসের প্রবাসীতে বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছি। তাহার পুনরাবৃত্তি নিম্প্রয়োজন। শ্ৰীললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ।