পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


একবার পথে নামিয়া দেখিয়া আসিল, বাবা অনেক দরে চলিয়া গিয়াছে। তখন সে আপনার ঘনসি হইতে একটি চাবি বাহির করিয়া তহবিল বাক্সটি খালিয়া ফেলিল । তৈলোতজবল কৃষ্ণমুখমণ্ডলে শুভ্ৰদন্তপংক্তির শোভা বিস্তার করিয়া বলিল,—“এঃ, আজ আর মেলা নেই; বেশী নিলে বাবা শালা টপ করে ধরে ফেলবে”—বলিয়া আমাকে তুলিয়া লইল আর একটা আধলি লইল, লইয়া কোঁচার খটে বাঁধিল, বধিয়া সমস্তটা পেটকাপড়ে গজিয়া রাখিল। বাক্স বন্ধ করিয়া তখন আবার পন্বমত ঘাড় কাঁপাইয়া তাহার সংগীতচচ্চা চলিতে লাগিল,— জীবন রামকে সঙ্গে করে, না হয় খাব ভিক্ষা করে, জীবনে জীবন রবে না—আ-আ-আ৷ ইত্যাদি তাহার আচরণ দেখিয়া আমি মনে মনে হাসিতে লাগিলাম ; ভাবিলাম, দেখ একবার, কলিকালে বাপ-বেটায় বিশ্বাস নাই, অন্য লোকের মধ্যে থাকিবে কি করিয়া ? সেই দিন বৈকালে তাহার পেটকাপড় হইতে একটি ময়লা ছিটের থলির মধ্যে আশ্রয়প্রাপ্ত হইয়া একটি ভাঙ্গা টিনের পেটারায় বন্ধ হইলাম। এ অবস্থায় আমায় মাস দই থাকিতে হইয়াছিল। একদিন শুনিলাম, মদিপত্র মামার বাড়ী যাইতেছে। যাহা আশা করিয়াছিলাম, তাহাই ঘটিল; যাত্রা করিবার সময় আমার থলিটি চপে চপে বাহির করিয়া লইয়া গেল। পথে যাইতে যাইতে পিতৃদত্ত সদ্যপায়ে অভিজাত আরও কয়েকটি টাকা থলির ভিতর রাখিয়া দিল। গোরর গাড়ীর গাড়োয়ান, কৃষাণ, রাস্তামেরামতকারী কন্ট্রাক্টরমিস্ত্রী প্রভৃতি বহুলোকের নিকট হইতে কলিকা লইয়া তামাক খাইতে খাইতে, কখনও উচ্চৈঃস্বরে কখনও গান গন করিয়া গান গাহিতে গাহিতে, সহচারী লোকদিগের নাম, ধাম, গন্তব্যস্থান, পিতৃপুরুষের পরিচয় সম্বন্ধে সহস্ৰ অনৰ্থক প্রশন কবিতে করিতে, বগলে ছাতা, বামহসেত জনতা ও দক্ষিণে পটেলী লইয়া অবশেষে টেশনে উত্তীর্ণ হইল । টিকিট কিনিবার সময় আমাকে ছাড়িয়া দিল, আমি সেই দগন্ধময় বসন্ত্রকারাগার হইতে মুক্তিলাভ করিয়া বাঁচিলাম। টিকিটবাব আমাকে পাইবামাত্র একবার ঠং করিয়া টেবিলে তাছাড় দিলেন,—আমি ভাবিলাম, “বাবা, বহুনি হইল মন্দ নয়, এইরপ বারকতক হইলেই ত গিয়াছি!” যতক্ষণ টিকিট বিক্রয় চলিতে লাগিল, ততক্ষণ আমি চিৎ হইয়া টেবিলের উপরই পড়িয়া রহিলাম। আমার উপরে, পাবে, ঝন ঝন করিয়া আরও টাকা, আধলি, সিকি, দয়ানি, পয়সা সিয়া পড়িতে লাগিল। বিক্ৰয় শেষ হইলে, বাব ভিন্ন ভিন্ন মলোর মন্দ্র পথিক করিয়া গণিয়া সাজাইয়া ক্যাশ মিলাইতে লাগিলেন। শেষে আলমারি বন্ধ করিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। অনেকক্ষণ পরে পুনরায় টিকিটের ঘণ্টা বাজিল । আবার আলমারি খলিল। কিয়ৎক্ষণ পরে টিকিটবাবর একটি কার্য দেখিয়া আমি অত্যন্ত বিসিমত হইলাম। আলমারির একটি কোণে একটি টাকা একাকী পড়িয়া ছিল: বেশ করিয়া চাহিয়া চাহিয়া দেখিলাম সেটি অভিজাতবংশীয় নহে-অর্থাৎ তোমরা যাহাকে বল মেকি টাকা। টিকিটবাব এক ব্যক্তির নিকট টাকা লইয়া, সাঁ করিয়া সেই টাকা বাহির করিয়া তাহাকে ফিরিয়া দিলেন, বলিলেন—“বদলাইয়া দাও, এটা চলিবে না।” সে বেচারী তাঁহার জয়াচরী ধরিতে পারিল না; বলিল, “দোহাই হজর, আর আমার একটিও টাকা নেই, এই দ্যাখেন আমার কাপড়-চোপড়। যেমন করে হোক, দ্যান আমার নিবাহ করে কত্তা।” বাব রাঢ়সবরে বললেন—“একি কত্তার বাবার ঘরের কথা ? কি করে তোমায় নিৰ্বাহ করে দেব ? যখন আমার মাইনে থেকে কেটে নেবে তখন কোন বেটাকে ধরবো?” লোকটা যত কাকুতি মিনতি করিতে লাগিল, বাব মহাশয় ততই সপ্তমে চড়িতে লাগিলেন। তিনি অনায়াসেই সেই টাকা পরে অন্য কাহারও সকধে ঢাপাইতে পারিতেন, §