পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পড়িয়ে এসেছি। আমি হতভাগিনী পিপলো।”—বলিয়া সে চোখে অঞ্চল দিল । বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কক্ষচ্যুত হইয়া যেন আমার চারিদিকে ঘুরিতে লাগিল। আমি নারায়ণ স্মরণ করিয়া চক্ষ মদিলাম। আমার দেহ কাঁপিতে লাগিল। আর বসিয়া থাকিতে পারিলাম না—শয্যায় এলাইয়া পড়িলাম। প্রায় পাঁচ মিনিটকাল এইরুপ বিহবল হইয়া ছিলাম। তাহার পর আবার চক্ষ খলিলাম। একদটে সশীলা বা পিপলা যেই হোক—তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিলাম –সশীলাই ত—কে বলিল পিপলা ? অন্যে দুইজনের পাথক্য বঝিতে না পারকে-যাহার সঙ্গে আমি ছয় বৎসর ঘর করিয়াছি—তাহার সম্বন্ধে আমারও কি ভ্রম হওয়া সম্ভব ? বলিলাম, "তোমার এ কি নিষ্ঠর পরিহাস, সুশীলা ?” “পরিহাস নয়। সত্যিই সশীলাকে যমে নিয়ে গেছে।” “তবে যে বাবা আমাকে লিখেছিলেন, পিপলা মারা গেছে।” “বাবার তখন মাথার ঠিক ছিল না, তাই ওরকম লিখেছিলেন।” “কি বল তুমি ?” "যা সত্য ঘটনা, তাই আমি তোমায় বলছি। সুশীলাকে পড়িয়ে এসে, পরদিন বাবা মাকে বললেন—এখানে আমাদের কেউ চেনে না—সুশীলা মরেনি, হতভাগিনী পিপলাই মরেছে। এ বয়সে পিপলার বৈধব্যবেশ আমি চোখে দেখতে পারছিলাম না —দিন-রাত আমার বকে চিতার আগন জবলছিল। আজ থেকে ও অার পিপলা নয়, ও সুশীলা—ও গিয়ে ওর স্বামীর ঘর করুক।” আমি বপন দেখিতেছি, না জাগিয়া আছি, কিছুই বুঝিতে পারিলাম না, বলিলাম, “মা শনে কি বললেন?" “মা বললেন, ছি ছি, তাও কি হয় ? পিপলা সশীলা সেজে গিয়ে স্বামীর ঘর করবে কি ? জামাই কি এ জাল ধরতে পারবে না ? বাইরের লোক না পারকে, তুমি আমি যেমন ঠিক চিনি কোনটি পিপলা, জামাইও নিশ্চয় সেই রকম চিনবে যে, এ সশীলা নয়। তখন কি উপায় হবে ? অাব যদি ধর, জামাই চিনতে না-ও পারে, —হিদার মেয়ের পরলোক বলেও ত একটা জিনিষ আছে? জালিয়াতী করে, ইহলোকে দুদিন না হয় পিপলা সখভোগ করে নিলে। তারপর—পরলোকে কি উপায় হবে ?” —বলিয়া পিপলা চপ করিল। আমি কিয়ৎক্ষণ নীরবে থাকিয়া ব্যাপারটা তলাইয়া বঝিতে চেচ্টা করিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে বলিলাম, “তারপর ?” “তারপর বাবা বললেন, “আমি তোমাদের ও সব পরলোক-ফরলোক মানিনে।’ মা বললেন, “তা না মানতে পার, কিন্তু মানুষে মানুষে সত্য ব্যবহার আর জালজয়াচরির মধ্যে কোনটা ধম, কোনটা অধৰ্ম্ম—তা ত মান ?’ বাবা বললেন, তা মানি বটে।’ শেষকালে বাবাতে মায়েতে পরামশ হল স্ত্রীবিয়োগ হলে অনেকেই ত ছোট শালীকে বিয়ে করে। এই কাশীতে অনেক তান্ত্রিক সাধক, অনেক তান্ত্রিক সন্ন্যাসী আছেন, তাঁদের মধ্যে এক রকম বিবাহ প্রচলিত আছে তার নাম শৈব বিবাহ । তোমার মত করে, এখানে তোমাতে আমাতে শৈব বিবাহ দেওয়ার জন্যেই বাবার কাশী আসা। তোমার এ বিষয়ে মত কি, তাই জানবার জন্যে বাবা মা আমায় আজ পাঠিয়ে দিয়েছেন।” আমি কোনও উত্তর দিতে পারলাম না-চোখ বজিয়া চপ করিয়া পড়িয়া রহিলাম। কে এ ? কাহার সঙ্গে কথা কহিতেছি ? সুশীলা এ নয়, কে বলিল ? সুশীলা আর পিপলা—কোনটি কে ? তফাৎই বা কি ? এ ত ঠিক আমার সেই সশীলার মতই কথাবাত্ত কহিতেছে। “আমি পিপলো”—এ কথা না বলিলে, আমি ত ইহাকে সশীলা বলিয়াই গ্রহণ করিতাম। 8 R