পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১২৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আমায় পাকা করে দেবেন। আর বড় জোর বছরখানেক-পেন্সন তাঁকে নিতেই হবে —আর এক্সটেন্সন তিনি পাবেন না। তখন আমার ২৫০ টাকা মাইনে হবে, সে টাকায় কি এই কলকাতা সহরে আমরা ভদ্রভাবে গহন্থালী পেতে বসতে পারবো না ?” লীলা বলিল, “তা কেন পারবো না—তবে—” “তবে, কি বল ? ঈশবর যদি আমাদের সন্তানাদি দেন, তবে ঐ আয়েও সশঙ্খলে আমাদের চলবে না এই তোমার আপত্তি ? অবশ্য, ছেলেমেয়েদের দামী দামী পোষাক পরিয়ে, ঘরের মোটরকারে চড়িয়ে তাদের দামী স্কুলে পাঠানো চলবে না বটে। কিন্তু সন্তানের শিক্ষার জন্যে এটা নইলে কি চলে না ? আমার বাবাও গরীব ছিলেন, তাঁর বড় বাড়ী, মোটরগাড়ী এ সব কিছই ছিল না, অথচ আমাদের দই ভাই, তিন বোনকে তিনি সুশিক্ষিতই করতে পেরেছিলেন–তিনটির মধ্যে একটি মেয়ের ভাল বরে বিবাহও দিয়ে গেছেন। গহপথালী ভাবে জীবন যাপন করা, গহন্থালী ভাবে ছেলেমেয়ে মানুষ করা এতে এমন কি কট বা অপমান, লীলা ?” লীলা বলিল, “তুমি ত জান সরোজ-আমিও গরীবের মেয়ে—গহস্থালী ভাবেই মানুষ হয়েছি;—আমার বিবাহিত জীবনে ও আমার ছেলেমেয়ের জন্যে বড় বাড়ী, মোটরগাড়ী—এ সব কিছরই আবশ্যক আছে বলে আমি মনে করি না। তুমি অনেক দিন থেকেই আমায় পীড়াপীড়ি করছ—আমি রাজি হইনি—তোমায় যথেষ্টট ভালবাসি না, বা তোমায় আমার যোগ্যপাত্র বলে মনে করি না বলে নয়। ঈশ্বর জানেন, আমি তোমায় কত ভালবাসি। জগৎ জানেন, বরং আমিই তোমার যোগ্য পাত্রী নই; বেশী লেখাপড়া শিখতে পারিনি—ক্যামেবলের পাস করা লেডি ডাক্তার মাত্র-রাপ নেই—কালো আমি; তুমি আমাকে বিবাহ করবার জন্যে আগ্রহ করছ—এ ত আমার পরম সৌভাগ্য। কিন্তু আমি যে কেন রাজি হতে পারছিনে, তা আজ তোমায় বলি। তুমি জান, আমার মা নেই; ভাই বোন কেউ নেই;—আমার বাবা অথব্ব হয়েছেন, একান্ত অসহায়—আমি বিয়ে করে সবামীর ঘরে গেলে, আমার বাবাকে কে দেখবে শনবে—কে তাঁর সেবা করবে ? সেই কারণেই আমি তোমার প্রস্তাবে রাজি হতে পারিনে সরোজ—অন্য কোনও কারণ নেই।” —বলিয়া লীলা চপ করিল। - সরোজও প্রায় এক মিনিট কাল নীরব রহিল। তারপর সে সন্তপণে লীলার একখানি হস্ত নিজহস্তে গ্রহণ করিয়া বলিল, “এই মাত্র তোমার আপত্তি, লীলা? তা তুমি এতদিন কেন আমায় বলনি—তা হলে ত এর মীমাংসা অনেক দিন আগেই হয়ে যেতে পারত। তোমাকে বিবাহ করে আমি একদিন সখী হব—আমাদের ভবিষ্যৎ ঘরকন্নার একটি ছবি, এমন দিন নেই যে আমি কল্পনায় চিত্রিত করিনি; কিন্তু সে চিত্র থেকে তোমার বাবাকে আমি ত কোনও দিনই বাদ দিয়ে দেখিনি। তোমার বাবার কাছ থেকে তোমায় আমি ছিনিয়ে নিয়ে সংসার পাতবো—এমন হৃদয়হীন আমি ত নই লীলা! —তাঁকে আমাদের সংসারে নিয়ে এসে, আমাদের মাথার মণি করে রাখবো। তুমি একা তাঁর সেবা যত্ন করে থাক—আমরা দুজনে মিলে করবে। —তা হলে, আর ত কোনও বাধা নেই লীলা ?” লীলা বলিল, “কিন্তু তুমি ত জান সরোজ, তিনি বড়ই স্বাধীন প্রকৃতির মানুষ । তিনি যে জামাইয়ের সংসারে ভার বোঝা হয়ে বাস করতে রাজি হবেন, এমন ত মনে করা যায় না!" - “আমি কি হাতে পায়ে ধরেও তাঁকে রাজি করতে পারবো না ?” “আশা কম। তুমি তাঁকে বলে দেখতে পার। একটা কথা বলি, তুমি মনে কিছ: দুঃখ কোর না সরোজ—তুমি যদি মাসে মাসে তাঁকে সম্পর্ণে খরচ তাঁর কাছে নিতে স্বীকৃত হও, তাহলে তুমি আমি দুজনে মিলে তাঁর হাতে পায়ে ধরে হয়ত তাঁকে রাজি করতেও পারি।” 88