পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শ্রীবিলাস এই বষ প্রদোষে একাকী বসিয়া সরে করিয়া ঋতুসংহারের দ্বিতীয় সগ' পড়িতেছিলেন। ক্লমে এই পথানে আসিলেন ঃ– শ্রত্বো ধৰনিং জলমচোং ত্বরিতং প্রদোষে শয্যাগহং গরগাহাৎ প্রবিশন্তি নায"ঃ। এই স্থানটি পড়িয়া তাঁহার মনে দাম্পত্যভাব অত্যন্ত ঘনীভূত হইয়া আসিল। তিনি পসতক বন্ধ করিয়া উপন্যাসলোকবাসী নবপ্রণয়ীর ন্যায় ধীরমন্থরগতিতে অন্তঃপর অভিমুখে চলিলেন। শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন সেখানে সত্ৰী নাই। দাসী জানাইল, ঠাকুর পলাইয়া গিয়াছে; সেই জন্য "মা-জী স্বয়ং রন্ধনশালায় উপস্থিত আছেন । ইহা শনিয়া শ্রীবিলাস বাহিরে ফিরিয়া যাইবার উপক্ৰম করিতেছিলেন—এমন সময় সরোজবাসিনী প্রবেশ করিলেন ; আজ অকস্মাৎ ব্রাহ্মণ ঠাকুরের তিরোভাবে সরোজা বে অন্নপ্রণা-পদাভিষিক্ত হইয়াছেন, এই মমে একটা পরিহাস করিলেন, কিন্তু সরোজবাসিনী লখমণ্ডলে একটা ঘণার ভাব প্রকাশ করিয়া মুখ ফিরাইলেন। শ্রীবিলাস নাকি এই সরোজার সহিত অনেক দিন হইতে ঘর করিতেছেন—এই কারণে তিনি এরুপ আচরণে কিছুমাত্র বিসিমত হইলেন না। তখন কাব্যলব্ধ নায়কভাব বিস্মত হইয়া নিতান্ত সাধারণ সাংসারিকজনোচিত প্রশ্ন করিলেন—“আজ আবার বাবাজীর কি হইল ?” সরোজবাসিনী নিরক্তের। শ্ৰীবিলাস দাঁড়াইয়া ছিলেন, পালকের উপর বসিয়া বলিতে লাগিলেন—“আর পারাও যায় না। এমন করে তিন দিন অন্তর ঠাকুর পালালে—” সরোজবাসিনী বাধা দিয়া বলিলেন—“সমতার ঠাকুর ঐ রকমই হয়ে থাকে। তিন টাকার মাহিনায় কি আর ভাল ঠাকুর হয় ?” শ্ৰীবিলাস সঙ্গীর এই কয়টি সামান্য কথাতেই নিতান্ত আঘাত প্রাপ্ত হইলেন। মনে ছইল, সন্ত্রী এই উক্তিতে তাঁহার অকৃতিত্বের প্রতি লক্ষ্য বরিলেন। স্মরণ হইল সেই বাল্যকালে সরোজবাসিনীর পিতা কি শোচনীয় অবস্থা হইতে তাঁহাকে উদ্ধার করিয়াছেন – তিনি ত এক প্রকার পথের ভিক্ষক হইতেই চলিয়াছিলেন। সরোজবাসিনী বাল্যকাল হইতে শ্রীবিলাসকে স্বীয় পিতার অন্নদাস বলিয়াই জানিতেন—এখন সংস্কৃত মন্ত্র বলিয়া বিবাহ হইয়াছে বলিয়াই কি ঘণার ভাব তিরোহিত হইবে ? তিনি নিঃসংশয়িত ভাবে সিথর করিলেন, এই উক্তিতে তাঁহার "প্লীবিয়ন অরিজিনের" প্রতিও বক্লকটাক্ষপাত আছে —অর্থাৎ তাঁহার নজর ছোট, তাই তিনি তিন টাকায় রসয়ে বামন রাখিয়াছেন। কিন্তু শ্ৰীবিলাস এই কল্পিত অপমান সম্পণভাবে আত্ম-সম্প্ররণ করিতে সমর্থ হইলেন-ইহা তাঁহার বহুদিনের অভ্যাসের ফল। বলিলেন— “আজ আর থাক। বাজার থেকে জলখাবার আনিয়ে নেওয়া যাবে এখন। তুমি বস।” সরোজবাসিনী যেমন দাঁড়াইয়া ছিলেন, তেমনই রহিলেন। শ্রীবিলাস কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করিয়া শয্যা হইতে উঠিয়া সরোজার হস্তধারণ করিয়া সাদরে বললেন—“চল।” সরোজবাসিনী একটা যন্ত্রণাসচক উহহে শব্দ করিয়া হাত টানিয়া লইলেন। শ্ৰীবিলাস সভয়ে দ্রুত জিজ্ঞাসা করিলেন--"কি হয়েছে ?” সরোজবাসিনী বলিলেন—“হয়েছে আমার মাথা ও মডে" (যেন মাথা ও মণ্ড দুইটা সম্পণে বিভিন্ন পদার্থ ) - শ্ৰীবিলাস হাত টানিয়া দেখিলেন—অনেকটা পথান পড়িয়া গিয়ছে। তাহাতে সাদা সাদা ঔষধ লেপিত রহিয়াছে দেখিয়া মনে বড় দুঃখ হইল;—বলিলেন “আহাহা, বড় কট হয়েছে ত ! কেন তুমি রান্নাঘরে গেলে ? ছিঃ--এমন অসাবধান ।” বেশ চলিতেছিল এবং সম্ভবত নিরাপদে সমস্ত গোলমাল চকিয়া যাইত; কিন্তু এই শেষের কথাটিই সব মাটি করিয়া ফেলিল। “এমন অসাবধান !”—সরোজবাসিনী আহতা ফণিনীর ন্যায় গজিয়া উঠিল। সে চিরকাল ধনী পিতামাতার আদরের মেয়ে ছিল; —তাহাকে কখনও কোন গহকায্য করিতে হয় নাই ! রন্ধনাদি সম্বন্ধে তাহার একেবারেই

.* *