পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কালীর মোটা মোট দাগ উভয়ের চক্ষে পড়িল । ঠাকুরদাদা বললেন—“এ কালীর দাগ কে দিলে ?” শ্রীবিলাসের বঝিতে বাকী রহিল না দাগ কে দিয়াছে। ক্ষোভে, অপমানে তাঁহার সব্বশরীর সপদেষ্ট মনষ্যের মত ঝিম্ ঝিম করিতে লাগিল। স্বর বন্ধ হইয়া আসিল । চক্ষ দিয়া যেন আগন বাহির হইতে লাগিল। তিনি আত্মগোপন করিবার জন্য বিপল চেষ্টা করিলেন; কিন্তু পারলেন না। ঠাকুরদাদা এতক্ষণ পত্র পাঠ করিতেছিলেন। পাঠ শেষ হইলে পনবার জিজ্ঞাসা করিলেন—“এ কালীর দাগ কে দিয়েছে হে ?” শ্ৰীবিলাস প্রথমবারে কথা কহিতে পারেন নাই বলিয়া ঠাকুরদার প্রশেনর উত্তর দেন নাই; এঝর বললেন—“যখন আমি পত্র খলি, তখন এ দাগ ছিল না। আমার স্ত্রী এ দাগ দিয়াছে, তাহাতে সন্দেহ নাই।” বদ্ধ বলিলেন—“দেখিলে একবার । সন্ত্রীলোকের পদ্ধা দেখিলে! স্বামী—যে স্বামী গরের গর-তাহার এমন করিয়া অপমান ! হায়রে কলিকাল ! এই বয়সে (যঠি বৎসরের কম ত নহে!) কত দেখিলাম, আরও কত দেখিতে হইবে । এমন শয়তানী সত্ৰীলোকের নরকেও প্ৰথান হইবে না। মনার আইন— ভক্ত রং লঙ্ঘয়েদ যা তু সন্নী জ্ঞাতিগণদীপতা তাং শবভিঃ খাদয়েদ্রাজা সংস্থানে বহুসংসিথতে। অর্থাৎ কিনা যে স্ত্রী আপনাকে ধনিকন্যা বা রুপবতী মনে করিয়া ভৰ্ত্তারং-নিজ পতিকে লঙ্ঘয়েৎ—অথাৎ অপমানিত করে, রাজা তাহাকে বহুসংস্থিতে—কিনা অনেক লোকের সমক্ষে আনিয়া শবভিঃ বলতে কুক্কর দিয়া খাওয়াইবেন।—কিন্তু এখন মনর আইন চলে না—এখন হনুর রাজ্য। কিন্তু শ্ৰীবিলাস তুমি যদি এই অপমান, এই নারীপদাঘাত সহ্য কর, তবে ধিক ধিক তোমাকে। তোমায় ধিক, তোমার পরষত্বে ধিক । তুমি আবার বিবাহ করিয়া ও সন্ত্রীকে বাড়ী হইতে দরে করিয়া তাড়াইয়া দাও।” শ্ৰীবিলাস চপ করিয়া মনের মধ্যে কথাটা তোলাপাড়া করিতে লাগিলেন। তাঁহাকে নীরব দেখিয়া ঠাকুরদাদার বক্ততার স্রোত পুনরায় খলিয়া গেল। বলিলেন, —“আজকাল ইংরাজি পড়িয়া লোকে সত্ৰীগলোকে আদর দিয়া দিয়া—মাথায় চড়াইয়। চুড়াইয়াই ত এই সব্বনাশটা করল । সাহেব বেটাদের মত সৈন্ত্রণ জাতি আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মাই—ইস্টেশনে দেখিয়াছি-বেটারা বেটীদের মাথায় ছাতা ধরিয়া সঙ্গে সঙ্গে যায়-যেন খানসামা! সেই সাহেবের শিষ্য ত তোমরা ! তুমি যদি সীর এই অতি গাঁহাত আচরণ ক্ষমা কর—প্রশ্রয় দাও—তবে তাহার দেখাদেখি দশটা ভাল প্রকৃতির সীলোকও বিগড়াইয়া যাইবে। আর যদি তুমি যথার্থ পরষ হও—ইহার উপযুক্ত শাস্তিবিধান কর, তবে ভয় পাইয়া দশটা বজাং সত্ৰীও শান্ত হইয়া আসিবে। এটা একটা সামাজিক কৰ্ত্তব্য বলিয়া জানিবে শ্রীবিলাস । কোম্পানী বাহাদর যে খনীর ফাঁসী দেন, সে কেন ? খন হইল, কোম্পানীর একটা প্রজা গেল। আর একটা প্রজার প্রাণ বধ করিয়া রাজস্ব কমাইবার প্রয়োজন কি ? না—দশ জনে দেখিয়া শিহরিয়া উঠিবে—ব্যপারে, খন করলে ত ফাঁসী যেতে হয় । সুতরাং তুমি আর ইতস্ততঃ করিও না। এই ১৭ই দিন আছে, বিবাহ করিয়া ফেল। আমি পাত্রী স্থির করিবার ভার লইলাম।” অবস্থাবিশেষে পড়িয়া মানুষের মন যে কি ভয়ানক পরিবত্তিত হইয়া যায়, তাহা ভাবিলে আশ্চৰ্য্য হইতে হয়। উনবিংশতি শতাব্দীর এই শেষভাগে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিপ্রাপ্ত যুবক শ্রীবিলাস,--মিল, বেকন, কারলাইলের ছাত্র শ্রীবিলাস-মিলন --সেক্সপিয়ার—শেলি—মাইকেল—বঙ্কিম-রবীন্দ্রের কাব্যোদানের মধ্য-রসগ্রাহী শ্রীবিলাস, অশলান বদনে বলিল,—“আমি বিবাহ করিব।” পঞ্জিকার মতে শুভদিনে ও শুভক্ষণে, এই পরম অশুভকর বিবাহ সম্পন্ন হইয় গেল। ృw