পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১৯৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ডোরা চলিয়া গেলে নিরঞ্জনের মনে হইল,—বাড়ীটা যেন বিষন্ন শমশানের আঁকার ধারণ করিয়াছে। বিদ্যুতের আলোক যেন আর তেমন উত্তজবলভাবে জনলিতেছে না। একখানা ঈজি-চেয়ারে পীড়য়া পড়িয়া নিরঞ্জন কত কি ভাবিতে লাগিল । রাত্রি ৮টার সময় রাম তাহার পথ্য—দ্ধ-পাঁউরটী আনিয়া হাজির করিল। নিরঞ্জন খাইতে বসিল, কিন্তু ভাল লাগিল না। এ কয় দিন ডোরাই তাহার পথ্য আনিয়া দিত এবং কাছে বসিয়া খাওয়াইত। কোনও রকমে কতকটা খাইয়া, আচমন করিয়া, নিরঞ্জন আবার ঈজি-চেয়ারে আশ্রয় লইল। চেয়ারে পীড়য়া থাকাও ভাল লাগে না। মধ্যে মধ্যে উঠিয়া, বাহিরের বারান্দায় পায়চারী করে। ক্লান্ত হইলে আবার আসিয়া চেয়ারে বসে। এইরুপ করিতে করিতে রাত্রি সাড়ে নয়টা বাজিয়া গেল। ঘুম পায় না। রাম আহার সারিয়া এই ঘরের মেঝেতেই নীচে বিছানা পাতিতে পাতিতে বলিল, “দাদাবাব এখনও শলে না । দশটা যে বাজতে চলল। শোও, নইলে আসখ করবে যে !” নিরঞ্জন বলিল, “ঘম আসছে না রে!” “কেন দাদাবাব ? রোজ ত এ সময় ঘমেও তুমি।” “আজ মনটা বড় খারাপ। আজ অনেক কথা ভাবছি।” রাম নিজ বিছানার উপর আরাম করিয়া বসিয়া বলিল, “কি ভাবছ, দাদাবাব ?” নিরঞ্জন বলিল, “দাখ-একা একা আর ভাল লাগে না। আমার বিয়ে করতে ইচ্ছে হয়েছে ” রাম বলিল, “বেশ ত সে ত ভাল কথা দাদীবাবু!—তুমি বিলেত থেকে ফিরে না এলে বিয়ে করবে না বলেছিলে—তাই ত এত দিন, মেয়ে দেবার জন্যে যে এসেছে, তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মামাবাবকে আমি চিঠি লিখে দিই—সবঘর সবজাতের একটি সন্দরী পত্রিী স্থির করে রাখনে। সামনে আশিবন কাত্তিক মাস, অগ্রহায়ণ মাস পড়তেই তোমার বউ এনে দিই। আমিও ত বড়ো হয়েছি, কবে আছি কবে নেই,— তোমায় যেমন কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলাম, তোমার দর একটি ছেলেমেয়েকেও মানুষ করে দিয়ে যাই।” নিরঞ্জন বলিল, “সবঘরে সবজাতে যদি নাই হয় ! আমি যদি অন্য জাতের কোনও মেয়েকে—যদি সে খাস্টানও হয়,—তাকে বিয়ে করি, তাতেই বা কি ?” বাম বলিল, “কায়েতের ছেলে হয়ে তুমি খিটেন বিয়ে করবে কেন, দাদাবাব ? ভাতে পিতৃপরিষের জল পিন্ডি লোপ হয়ে যাবে যে! মামাবাবই বা মত দেবেন কেন ?" নিরঞ্জন বলিল, “মামাবাব ত আর তোমাদের মত গোঁড়া হিন্দ নন!” রাম বলিল, “হ্যাঁ তা আমি জানি । মামাবাব ত ছোঁড়া বয়সে যখন এখানে কলেজে পড়তেন, তখন ত বেহ্ম সভায় গিয়ে খিটেন হবার মৎলবই করেছিলেন। ওনার বাপ মা এসে কত কষ্টে ওঁকে ফিরিয়ে বাড়ী নিয়ে গিয়ে বিয়ে দ্যান।” “তুই এত খবর জানলি কি করে রে ?” “আমি জানিনে ? আমার যখন গোঁফ উঠেনি, তখন থেকেই ত তোমাদের সংসারে আমি রয়েছি। কত্তামশায়ের বিয়ের পর, তিনি যখনই শবৃশরবাড়ী যেতেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ওনাদের ঝি-চাকরের কাছে তখন সব কথাই আমি শনেছিলাম।” “তা হলেই বুঝে দ্যাখ্য, কোনও খাটনি মেয়েকে যদি আমার বিয়ে করতে ইচ্ছে হয় —মামাবাব বোধ হয় বাধা দেবেন না।” রাম উচ্চ হইয়া উঠিয়া বলিল, “কি সব্বনাশ – দাদাবাব কি ভাবছ বল দেখি ? তুমি কি ডোরা দিদির কথা মনে করে আমায় এই সব কথা বলছ?” ১০২