পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/১৯৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেড় ক্লোশ দরে ইংরাজী স্কুলে ভক্তি করিয়া দিলেন। দশ বৎসরের একটি বধ্য এবং , , প্যারীচরণ সরকারের “ফাৰ্ট বক” প্রায় একসঙ্গেই ঘরে আসিল । আমার স্ত্রীর নাম মন্দাকিনী ; দেখিতে শুনিতে ভালই নেহাৎ “পাঁচ-পাঁচি” শ্রেণীর নহে। এমন সশ্রী ও বৃদ্ধিমতী মেয়ে আমাদের জাতির মধ্যে নিতান্ত দলভি, এ কথা আমি বলিলে হয় ত জাঁক করা হইবে; কিন্তু না বলিলে সত্যের অপলাপ হইবে ইহা নিশ্চয়। খাজনার জমি আমাদের যাহা ছিল, তাহার অধিকাংশই ভাগে দেওয়া ছিল । অলপ কয়েক বিঘা, বাবা "কৃষাণ” রাখিয়া চাষ করাইতেন। বলিতেন, খোকা পাস করিয়া যখন চাকরি-বাকরি করিবে, তখন সে জমিগুলাও তিনি ভাগে বিলি করিয়া দিবেন। কিন্তু তাঁর এত সাধের খোকার পাস করা তিনি ত দেখিয়া যাইতে পারিলেন না! দুই বছর পর্বে অলপ কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনি ও আমার জননী বগারোহণ করিয়াছিলেন। বাইশ বৎসর বয়সেই আমার পাস করিবার কথা, কিন্তু উপযর্ন্যপরি দুইবার ফেল হওয়ায় বয়সটা একটা অধিক হইয়া পড়িয়াছিল! পাসের সংবাদ পাইয়া আমি পঠিা বলি দিয়া কালীমন্দিরে পজো দিলাম ; বন্ধ বান্ধবকে নিমন্ত্ৰণ করিয়া, লচিমাংস ভোজন করাইলাম। সে দিন বড় আনন্দ হইয়াছিল। আবার বাবার কথা মনে পড়িয়া চোখে জলও আসিয়াছিল । অতঃপর চাকরির উপায় চিন্তা করতে লাগিলাম নিজ চাষের জমিগুলি বাবার মৃত্যুর পরেই আমি ভাগে বিলি করিয়া দিয়াছিলাম; চাষবাস দেখিতে হইলে আর পড়াশুনা হয় না। এখন চাকরি কোথায় পাই ? এ পল্লীগ্রামে চাকরি আমায় কে দিবে ? ' বউ বলিল, “আমায় বাপের বাড়ী রেখে, দুগণ শ্রীহরি বলে তুমি বেরিয়ে পড়, কলকাতায় যাও। এত বিদ্যে শিখেছ, সেখানে গেলে তোমার চাকরির ভাবনা কি ? চাকরি হ'লে একটা ছোট দেখে বাসা ভাড়া করে আমায় এসে নিয়ে যেও।” এ যুক্তির সারবত্তা বুঝিতে পারিলাম। সদগোপের ঘরের মেয়ে, তায় কুড়ি বৎসর মাত্র বয়স, মন্দার বন্ধি দেখিয়া সত্যই সময়ে সময়ে বিসিমত হইয়া যাই। কিন্তু বড় সব্বনেশে কথা যে ! সাত আট বৎসরকাল একাদিক্ৰমে দুইজনে একসঙ্গে রহিয়াছি । গ্রামেই শবশুরবাড়ী, বউ বাপের বাড়ী গেলেও, দইজনের বিচ্ছেদ ঘটে নাই। তাহাকে ছাড়িয়া কলিকাতায় যাইতে হইবে ভাবিয়া প্রাণটা কেমন করিয়া উঠিল। তার হাতের রান্নাটি আমার যেমন মিটি লাগে, কই, আর কাহারও রান্না ত তেমন লাগে না ! সে কাছে বসিয়া না খাওয়াইলে আমার যে খাইয়ারই সুখ হয় না। তার হাতের সাজা পাণ না হইলে পাণ খাইয়া আমার তৃপ্তি হয় না ;–কত লোকের বাড়ী বেড়াইতে যাই, তারা পাণ দেয়, খাই ত ! সে কাছে থাকিবে না, শয়ন করিলে আমার পায়ে হাত বলাইয়া দিবে না, আমার ঘুম আসিবে কি করিয়া ? এই সাত আট বৎসর কাল, প্রতিদিন প্রাতে ঘুম হইতে উঠিয়া তার মখখনি দেখিয়াছি—দিন ত এতকাল এক রকম সখেই কাটিয়াছে। কলিকাতায় প্রভাতে উঠিয়া কার মুখ দেখিব,—তার পর ট্রাম হইতেই পড়িয়া যাইব, না গডোর হুরীতেই প্রাণ হারাইব, কে বলিতে পারে ? বউয়ের প্রস্তাব শুনিয়া এই সকল কথাই আমি মনে মনে আলোচনা করিতেছিলাম, সে আমাকে চিন্তান্বিত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “অত কি ভাবছ গা ? কলকাতায় যেতে বলেছি বলে রাগ হ’ল বুঝি ?” বলিলাম, “না, রাগ হবে কেন ?” “তবে ? মুখখানি অমন করে রয়েছ যে ?” খোলাখুলি বলিয়াই ফেলিলাম। জানি, ইহা শনিয়া তাহার দেমাক বাড়িবে—তা বাড়ে বাড়ুকগে! বলিলাম, ”তোমায় ছেড়ে একলা আমি কলকাতায় কি করে থাকবে, .তাই ভাবছি !” yet