পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/২০৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ওদের ঘুম ভাগবে না। চাকর-বাকর সকলেই জানে, নবাব সাহেব রাত্রে এখানে থাকলে ওৱা কখন ওঠে, তাই তারাও নিশ্চিন্ত হয়ে বেলা অবধি ঘমোয়। - পরামশ স্থির হইল, ভোর পাঁচটায় লায়লী আসিয়া আমাকে জাগাইয়া দিবে, আমরা উভয়ে পদব্রজে বড় রাস্তায় গিয়া পড়িয়া সেখানে ট্যাক্সি ধরিব। বেল। তখন ৯টা হইবে, আমাদের ট্যাক্সি পরো দমে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড দিয়া ছটিতেছিল। কিছু দরে দেখা গেল, কয়েকখানা গোরুর গাড়ী রাস্তার মধ্যভাগ জড়িয়া চুলিয়াছে। সে গাড়ীগুলিকে পাশে যাইবার জন্য ট্যাক্সিচালক ক্ৰমাগত হণ দিতে লাগিল, নিজ গাড়ীর বেগও কমাইয়া দিল। গাড়ীগলা পাশে গেলও। কিন্তু আমাদের ট্যাক্সিটা গাড়ীগলার পাশ্ববত্তী হইয়া হৰ্ণ দিবামাত্র একটা গাড়ীর গর ভয় পাইয়া, ছটিয়া গাড়ীখানা আড়াআড়িভাবে রাস্তার মধ্যস্থলে লইয়া গেল! ফলে আমাদের ট্যাক্সি ভীষণ ধাক্কা খাইয়া রাস্তার পাশবসথ খালের দিকে কাৎ হইয়া পড়িল। আমি ছিটকাইয়া কিয়ন্দরে আছাড় খাইয়া পড়িবামাত্র হঠাৎ আমার মুখ দিয়া বাহির হইল—বাপ! কটে উঠিয়া বসিলাম। ট্যাক্সি কাৎ হইবার পর্বেই ড্রাইভার লাফ দিয়া নামিয়া পড়িয়ছিল। দেখিলাম, গাড়ীর দরজা খালিয়া, লায়লীর হাত ধরিয়া তাহাকে সে টানিয়া বাহির করিতেছে। বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়া লায়লী থরথর করিয়া কপিতে কাঁপিতে বসিয়া পড়িল । দুই হাতে নিজ মাথা চাপিয়া ধরিল। আমি যেখানে পড়িয়াছিলাম, সেইখান হইতে চীৎকার করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “বড় লেগেছে, লায়লী ?” অসফট স্বরে যাহা বলিল, তাহা বঝিতে পারলাম না। এই সময় কলিকাতার দিক হইতে আর একখানি মোটর গাড়ী ছটিয়া আসিতেছে দেখা গেল। আমি ভাবিলাম, "এই রে! আমাদের ধরতে আসছে বোধ হয়।” কিন্তু দেখিলাম, সে আশঙ্কা অমলক। এক সাহেব ও এক মেম সে গাড়ীর আরোহী। আমাদের অবস্থা দেখিয়া, তাহারা গাড়ী দাঁড় করাইয়া আমাদের নিকট আসিল। লায়লীর অবস্থা দেখিয়া সাহেব বলিল, “মেয়েটি মচ্ছা যাইতেছে—” বলিয়া পকেট হইতে ব্র্যাডি-ফ্লাক বাহির করিয়া লায়লীকে পান করাইয়া দিল। বলিল, “কুছ ডর নেই বেটী! আবি আচ্ছা হো যাগা।” আমার কাছেও আসিল এবং হাত ধরিয়া আমাকেও তুলিল, আমাকেও ব্র্যান্ডি পান করাইয়া দিল। আমায় জিজ্ঞাসা করিল, “তোমরা কোথায় যাইতেছিলে ?” আমি উত্তর করিলাম—“ব্যান্ডেল।” ** বলিল, “ব্যান্ডেল আর বেশী দরে নহে—চল, আমরা তোমাদের পৌছাইয়া !" আমি এক দিকে, সাহেব এক দিকে লায়লাকে ধরিয়া, গাড়ীর নিকট লইয়া গেলাম। মেমসাহেব তাহাকে তুলিয়া লইয়া নিজ পাশেব বসাইলেন। আমি সামনের দিকে সাহেবের পাশেব" বসিলাম.। ব্যান্ডেল টেশনে পেপছিয়া শুনিলাম, দশ মিনিট পরে একখানি আপ ট্রেণ আসিবে। লায়লীকে ওয়েটিং রমে বসাইয়া আমি গিয়া টিকিট কিনিয়া আনিলাম। দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট কিনিলাম, যাহাতে লায়লী আরামে শ্যইয়া যাইতে পারে। ট্রেণ ছাড়িলে লায়লী বলিল, “দাদা, তুমি এত দিন বোবা সেজেছিলে কেন ?" আমি বলিলাম, "সেজেছিলাম ? তুমি কি মনে কর, আমি ভাণ করতাম ?” “তবে এখন কথা কইছ কি ক’রে ?” বলিলাম, "কি ক'রে তা জানিনে। একটা ধাক্কায় বাকশক্তি হারিয়েছিলাম, আর একটা ধাক্কায় বাকশক্তি ফিরে পেলাম। কি করে পেলাম, তা আমি জানিনে—তা ডাক্তারেরা বলতে পারেন বোধ হয় ।” 336: