পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/২২২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গেল। তাই সঙ্গে ছাতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। এমন লোক নাই, এমন সথান নাই —যাহার পঙ্খোনুপুঙ্খ সংবাদ নানী বলিতে পারে না; এমন বিষয় নাই—যাহা তাহার অজ্ঞাত। এমন কি, সাহেব লোক মরিলে তাহার কবর খাঁড়িতে নয় ফিট গত্ত করা নিয়ম, তাহাও সে অবগত আছে। সে জাতিতে পাহাড়িয়া (নেপালী) হইলেও হিন্দী বেশ বলিতে পারে; সুতরাং তাহার সহিত কথাবাৰ্ত্ত কহিতে আমাদের কোনও অসুবিধা নাই। নানী ডোমারাম বস্তিতে মাসিক দই টাকা ভাড়ায় এক ঘর লইয়া বাস করে । প্রাতে আসিয়া, এবং রাতে বিদায়কালে নিত্য বলে, বাব সেলাম, মাইজী সেলাম, খাকী সেলাম, ঠাকুর সেলাম —যদিও তাহার শাখা মাহিনা, তথাপি ঠাকুর রোজ তাহাকে একথালা ভাত দেয়—তাই ঠাকুরও সেলাম—ঠাকুরের এই খাতির। আমরা পেপছিবার কয়েক দিন পরে খাকী হাসিতে হাসিতে আসিয়া বলিল, “মা, শনেছ, নানীর এক মেয়ে আছে, তার নাম কি জান ?” বলিলাম, “না, কি নাম ?” 本 "তার নাম-ঘড়ি।”—বলিয়া সে হাসিয়া লটাইতে লাগিল। হাসি থামিলে বলিল, “আচ্ছা মা, সে মেয়েকে যদি আমাদের স্কুলে ভত্তি করতে হয়, তবে রেজিটারিতে তার কি নাম লেখানো হবে ? শ্ৰীমতী ঘড়িসন্দরী দেবী ?”—বলিয়া পনশ্চ সে হাসির ফোয়ারা খলিয়া দিল। : আমি বলিলাম, "যেমন অদভুত দেশ, নামগুলোও কি তেমনি অদভুত ! কত বড় মেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিস ?” “হ্যাঁ, আমার চেয়ে বড়। নানী বললে, তার বয়স, সতেরো। কোন এক সাহেবের কুঠিতে সে আয়গিরি করে, মেম-সাহেবের লেড়কা খেলায়। মা, তাকে একদিন নিয়ে আসতে বল না নানীকে, আমি ঘড়ি দেখবো।” বললাম, “আচ্ছা, বলবো।” দএক দিন পরে নানীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “নানী, তোর খসম আছে ত ?” নানী বলিল,“উ তো বহৎদিন ভাগ গিয়া।" বলিলাম, “ভাগ গিয়া কি রে? কোথা ভাগ গিয়া ?” নানী তখন তার জীবনের ইতিহাস সংক্ষেপে বলিল। বলিল, তাহার কন্যা যখন মাত্র দই বৎসরের, তখনই তার স্বামী পলাইয়া এক সাহেবের সহিত কলিকাতা চলিয়া যায়। না লেখে চিঠি-পত্র, না পাঠায় টাকা-কড়ি। কিছুদিন তার জন্য অপেক্ষা করিয়া নানী উদরান্নের জন্য, ডাউহিল স্কুলে আয়গিরি চাকুরী গ্রহণ করে। সে স্কুলে খালি সাহেবদের মেয়ে পড়ে। অনেক মেয়ে সেই স্কুলে বাসও করে, বেডিং হাউস আছে, আবার অনেক মেয়ে বাহির হইতে আসিয়া পড়িয়াও যায় । চারি পাঁচ বৎসর পরে, কলিকাতা হইতে আগত এক সাহেবের খানসামার মুখে সে তার স্বামীর সংবাদ পায়। সে নাকি এক বড়া সাহেবের বাবচ্চি গিরি করিতেছে, এবং সেখানেই এক সবজাতীয়া মেয়েকে বিবাহ করিয়া, নতন সংসার পাতিয়া, সখে স্বচ্ছন্দে আছে। সেই সাহেবের ঠিকানায় স্বামীকে সে এক পরও লেখাইয়াছিল; কিন্তু কোনও উত্তর পায় নাই। তার পর হইতে কত লোককে সে জিজ্ঞাসা করিয়াছে, কিন্তু কেহই তাহার স্বামীর সংবাদ বলিতে পারে নাই। দই বৎসর হইল, স্কুলের সে চাকরী তাহার. গিয়াছে। তাহার জিমা হইতে এক দুষ্ট “বাবা” (মেয়ে) পলাইয়া যায়, তাই সাহেবরা তাহাকে তাড়াইয়া দিয়াছেন। তারপর হইতে সে কখনও সাহেবের বাড়ীতে আয়গিরি, কখনও বাঙ্গালীর বাড়ীতে নানীগিরি করিয়া জীবন-যাপন করিতেছে। বলিলাম, “তবে এদিকে দশ বারো বছর তোর স্বামীর আর কোনও খবর পাসাঁন?” “না মাইজী ’ “সে বেচে আছে কি ম’রে গেছে তাও জানিস না ?” ১২৮