পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/২২৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


এক সপ্তাহ হইল, সাধার কলেজ বন্ধ হইয়াছে; কিন্তু এখনও সে আসে নাই। সে জন্য আমরা মহা ভাবনায় পড়িয়া গিয়াছি। আমরা যখন কলিকাতা ছাড়িয়াছিলাম, তখনও মহাত্মা গান্ধীর লবণ-সত্যাগ্রহ আরম্ভ হয় নাই। লবণ-সত্যাগ্রহ আরম্ভ হইবার কথা এখানে আসিয়া খবরের কাগজে পড়িয়াছি। মহিষবাথানে গোলমালের কথা, যতীন সনগাপ্তের গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডের কথা প্রভৃতিও পড়িয়ছি। প্রত্যহই সংবাদপত্রে দেখি, গোলমাল বাড়িয়াই চলিয়াছে, থামিবার কোনও লক্ষণ নাই। সন্ধা যদিও সত্যাগ্রহী দলে যোগদান করে নাই, তথাপি আমরা জানি, তাহার ষোল আনা ঝোঁক সেই দিকেই। কলেজ বন্ধ হইল, ছেলে কলিকাতায় কি করিতেছে? এমন সময় কত্তার নামে সন্ধর এক পত্র আসিল, সে পত্র পড়িয়া আমাদের মাথা ঘুরিয়া গেল। সত্যাগ্রহ সম্বন্ধে সে উচ্ছসিত ভাষায় তাহার পিতাকে লিখিয়াছে— "আপনি জিজ্ঞাসা করিতে পারেন, ফল কি হইল ? যে ফল দশ বৎসর পরে প্রকট হইবে, সে ফলের কথা না ধরিলেও আমরা যে আশাতীত ফল পাইয়াছি, তাহা অস্বীকার করিবার যো নাই। আপনি লাঠি লইয়া মারিতে আসিলে আমিও লাঠি লইয়া মারিতে ষাই এটা সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু আপনি তোপ-বন্দকে লইয়া গলী করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছেন, আর আমি বক ফলাইয়া মারো বলিয়া দাঁড়াই এটা বাঙ্গালীর পক্ষে ত বটেই, সকল জাতির পক্ষেই অসাধারণ ব্যাপার। আর যেখানে এরূপ ব্যাপার একটি দটি নহে, সহস্রাধিক হইয়া গিযছে, সেটাকে আশাপ্রদ চিহ্ন বলিয়াই ধরিতে হইবে।” কলিকাতার অবস্থা বর্ণনা করিতে গিয়া লিখিয়াছে— • “সবাপেক্ষা আশ্চৰ্য্য বিষয়, বিনা চেণ্টায়, বিনা প্রোপাগাণ্ডায় একদিনে বাংগালী সিগারেট ছাড়িয়া দিয়াছে। কোনও পাণওয়ালাব নিকট সিগারেট পাইবেন না। একজন নিল্পীজ বাঙ্গালী এক খোট্ট পানওয়ালার কাছে কাঁচি-মাকৰ্ণ সিগারেট চাহিয়াছিল, সে খানিকক্ষণ অবাক হইয়া বাবর মাখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া শেষে বলিল—‘বাব, কাঁচমাকৰ্ণ নেহি হ্যায়, জুতি-মাকা হ্যায় খাওগে’ ?” ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পত্রে সে তার পিতাকে কমে ইস্তফা দিবার জন্য বিশেষ অননয় করিয়া লিখিয়াছে। পত্র পড়িয়া উনি ত তেলে-বেগানে জনলিয়া উঠিয়াছেন। বলিলেন, “দেখেছ ছেলে বেটার কাণ্ড ! আমি জয় মহাত্মা গান্ধী বলে চাকরীটি ছেড়ে দিই, তারপর খাই কি ? ন,ণ ? নরণ খেয়ে ক'দিন বাঁচবো ?” ছেলেট প্লাছে সত্যাগ্রহীর দলে ভিড়িয়া যায়, এই ভাবনায় আমরা স্বামী-স্ত্রী অস্থির হইয়া উঠিলাম। বন্ধি খাটাইয়া ছেলেকে পত্র লিখিলাম-- “বাবা সন্ধা, উনি তোমার পর পাইয়াছেন, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা-বশতঃ নিজে উত্তর লিখিতে পারলেন না। শরীরের উন্নতির জন্য পাহাড়ে আনিলাম, কিন্তু উন্নতি তেমন ত দেখিতে পাইতেছি না। বিদেশ-বিভূ-ই, যদি অসুখ বাড়ে, তবে আমি একা সত্রীলোক তাঁহাকে লইয়া আতান্তরে পড়িয়া যাইব । এক সপ্তাহ হইল, তোমার কলেজ বন্ধ হইয়াছে, তুমি সেখানে কেন দেরী করিতেছ, ববিতে পারিতেছি না। পত্রপাঠমাত্র তুমি চলিয়া আসিবে, একটি দিনও বিলম্ব করিও না।” ... “ চিঠির ফল ফলিল, সন্ধা চলিয়া আসিল। পোষাক তাহার আগাগোড়া খন্দরে নির্মিত। খড়কীর ও আমার জন্য এক বোঝা খন্দরের শাড়ী, শেমিজ প্রভৃতি লইয়া আসিয়াছে। বলিল, “মা, তোমাদের খদ্দর ছাড়া অন্য কিছুই আর পরা চলবে না।” আমি বলিলাম, “খদর ত পরবোই বাবা! কিন্তু যা আছে, সে কাপড়-চোপড়গুলো ছিাড়কে আগে।” প্রথমে সে বলিল, ও-সব পোড়াইয়া ফেলাই উচিত। অনেক টাকার জিনিষ, সব পোড়াইয়া লোকসান করিবার মত অবস্থা আমাদের নয়, এই সব অজুহাতে শেষে রফা হইল, বাড়ীতে সেগলা পরা চলকে, কিন্তু বেড়াইতে বাহির হইবার সময় খন্দরই পাঁরতে হইবে। তথাস্তু। ১৩e