পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/২৩৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গহিণী, উগ্ৰচণ্ডা-মাত্তি। তত্ত্ব-সামগ্রী বারান্দাময় ছড়ানো—পরে শনিয়াছিলাম, তিনি সেগুলি, লাথাইয়া লাথাইয়া ইতস্ততঃ নিক্ষেপ করিয়াছেন। আমাকে দেখিবামাত্র ঝঙ্কার দিয়া তিনি যে সব কথা বলিলেন, তাহার উল্লেখ করিয়া আর কাজ নাই। যে লোকটি তত্ত্ব অনিয়াছিল, সে বারান্দার কোণে বসিয়া হাঁটর ভিতর মুখ লুকাইয়া কাঁদিতেছে। গৃহিণী তাহাকে বলিতেছেন, “ওঠ বেটা নচ্ছার পাজি চাষা, তোল এ-সব জিনিষ তোর তোরঙ্গে, ফিরিয়ে নিয়ে যা—এ-সব আমি চাইনে।” আমি গহিণীকে বললাম, “ছি ছি কি করছ পাগলামী ? বলিয়া জিনিষগুলি আমি কুড়াইয়া কুড়াইয়া গছাইয়া রাখতে লাগিলাম । কত কন্টে কত সাধ্য-সাধনায় তাঁকে ঠাণ্ডা করিলাম তাহার বিস্তারিত বিবরণে আর প্রয়োজন নাই। জিনিষগুলি তিনি রাখিলেন, কিন্তু ছেলেকে শবশরে-বাড়ী পাঠাইতে কিছুতেই রাজি হইলেন না। অধিকন্তু তাহকে বলিলেন, “খপদার সে বউয়ের কখনও মুখ দেখবি ত মাতৃহত্যের পাতক হবি। এগজামিনটে হয়ে যাক, এবার কোনও ভম্বদর-লোকের মেয়ে এনে তোর বিয়ে দেবো। সে বউ ত্যাগ করলাম আমি।” গহিণীকে বলিলাম, “অনেক পথ হেটে এসেছে, লোকটিকে জল-টল খাবার দাও।” তাহাকে বলিলাম, “তুই বাবা আজ এখানে থেকে বিশ্রাম কর। কাল ভোরে উঠে তখন যাস ।”—বলিয়া আমি বৈঠকখানায় চলিয়া গেলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে দেখি, লোকটি বাহির হইয়া আসিতেছে। আমাকে প্রণাম করিয়া বলিল, “বাবা-ঠাকুর, আমি চললাম।” আমি বলিলাম, “এখনি চললি ? খাওয়া-দাওয়া হ’ল না। খাওয়া-দাওরা করে এখানে ঘামিয়ে কাল সকালে গেলে হত না ?” - সে বলিল, “কাল সকালেই রওয়ানা হব বাবা-ঠাকুর। এ-গাঁয়ে আমার একঘর কুটবে আছে, তাদের সঙ্গে দেখা-শ্যনো করাও দরকার, রাতটে সেইখানেই থাকবো।” “সেইখানে থাকবে ? আচ্ছা তা বেশ ; বোস তাহলে একট। বেয়াই-মশাইকে চিঠি একখানা লিখে দিই। ঐখানে তামাক-টিকে সব আছে, তামাক সাজ।” গোবদ্ধন তামাক সাজিতে বসিল। আমি বেহাইকে পত্র লিখিলাম। লিখিলাম, “আপনার প্রেরিত উপহার দ্রব্যগলি পাইয়া আমরা সকলে বিশেষ আনন্দিত হইয়াছি। আপনার সাদর আহবানে প্রফুল্ল বাবাজীবনকে এই সঙ্গে পাঠাইতাম, কিন্তু পরীক্ষার আর বেশী বিলম্বব না থাকায়, বাবাজীবন এখন পড়াশনা লইয়া অত্যন্ত ব্যস্ত। এখন সেখানে গেলে ব্যথা কয়েকদিন সময় নষ্ট হইবে। পরীক্ষাটা হইয়া যাক, আপনার জামাই আপনারই রহিল, বাবাজীর এখন যাওয়া হইল না বলিয়া আপনি বা বেয়ান-ঠাকুরাণী যেন দুঃখিত না হন ইহাই আমার প্রার্থনা। বধমাতার জন্য সামান্য কিঞ্চিৎ উপহার যাহা সংগ্ৰহ করিতে পারিয়াছি, আগামী পঞ্চমীর দিন তাহা পাঠাইব । দোষ ক্রটি মাজনা করিয়া তাহা গ্রহণ করিলে কৃতাৰ্থ হইব।”—ইত্যাদি। পত্র লেখা শেষ করিয়া, গোবন্ধনকে নিকটে ডাকিয়া তাহার হাতে পত্ৰখানি দিয়া বলিলাম, "বাবা গোবদ্ধন, এই চিঠিখানি বেয়াইকে দিবি। আর, আমার একটি কথা তোকে রাখতে হবে, বাবা!” "কি কথা কত্তা-মশাই ?” “এখানে যা দেখলি শনাল—এই রাগের মাথায় গিন্নী যা বলেছেন করেছেন, সে সব আর সেখানে প্রকাশ কীরসনে বাবা ? কুটবিতা স্থলে এ সব আকছার হয়েই থাকে, কোন সংসারে না হয় ? কিন্তু জানতে পারলে বেয়াই বেয়ান মনে বড়ই কট পাবেন। এ-সব কথা ঘৃণাক্ষরেও সেখানে প্রকাশ করিসনে লক্ষী বাপ আমার ! আমি বন্ধ ব্লাহ্মণ, তোকে আশীব্বাদ করছি, তোর ভাল হবে। আমি চিঠিতে লিখে দিলাম যে জিনিষপত্তর তিনি যা পাঠিয়েছেন তা পেয়ে আমরা খুব খসী হয়েচি। বুঝলি ত ? 28°