পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/২৯৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জাগিতে লাগিল। খানকতক কাগজ সংগ্ৰহ করিয়া, চন্দ্রমোহন পুস্তকাকারের একখানি দিব্য খাতা সিলাই করিল। ভিতরে প্রথম পাতায় ধরিয়া ধরিয়া বড় বড় করিয়া আ আ লিখিল। পরের পাতায় আর একটু ছোট ছোট করিয়া ক খ লিখিল; তাহঁর পর কর, খল না লিখিয়া দুই অক্ষরে ঐরপ অন্য অন্য কথা-কল, খগ,—ইত্যাদি লিখিল ; এইরপে বদলাইয়া বদলাইয়া অথষক্ত ও অর্থবিহীন অসংযুক্ত বর্ণ শব্দরাশি পথানে পথানে সন্নিবদ্ধ করিল। পাড়ার ছেলেগলার নাম করিয়া, কে ছারিতে পা কাটিয়া ফেলিয়াছে, কাহাত্র পাঁড়বার বই নাই, কে পাঠশালায় যায় না, কে তিন দিনে নতন বহি কুটি কুটি করিয়া ছিড়িয়া ফেলে, কে-ই বা তাহা যত্ন করিয়া পড়িয়া শেষে ছোট ভাইয়ের কাজে লাগাইয়া দেয়, কে বাড়ীতে আসিয়া নানারপ উৎপাত করে, কে "লক্ষী" হইয়া পড়াশনা করে,~ইত্যাদি সমসাময়িক ইতিহাসে পাঠের পর পাঠ পর্ণ করিয়া ফেলিল। পসেতকের শেষে ১ হইতে ৯ পর্য্যন্ত অঞ্চক এবং উপরে প্রত্যেকের নাম, তাহারও ক্রটি হইল না। এইরুপে প্রথমভাগ রচনা শেষ হইল। মলাটের উপর স্বীয় চিত্রবিদ্যার অপব্ব নমনা রাখিয়া বর্ডার প্রস্তুত করিল। তাহার পর যথাস্থানে লিখিল—“বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ —ঞ্চন্দ্রমোহন বিদ্যাসাগর প্রণীত।" বুঝি তাহার ধারণা ছিল, প্রথমভাগ লিখিতে পারলেই বিদ্যাসাগর উপাধি গ্রহণের অধিকার জন্মে ! একদিন একজনকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল— “প্রথমভাগে ঐ ষে গোপালের, রাখালের কথা লেখা আছে, ও সব কি সত্যি ?” সে বলিল —”সত্যি না আরো কিছ ! ও সব বানানো।” সেই অবধি সে মনে করিত, আমার প্রথমভাগে সমস্তই সত্যকথা রহিল, তবে আমার খানিই ভাল। একদিন কেমন করিয়া এই গ্রন্থকার-বালকের প্রথম উদ্যমখানি কৰ্ত্তাদের চোখে পড়িল । তাঁহারা ইহা পাঠ করিয়া হাসিয়াই আকুল হইলেন। বাটীর সকলে একত্র হইয়া এই ! অপৰব প্রথমভাগ শ্রবণ করিতে লাগিলেন। সকলেই বলিলেন,—"বাঃ চন্দোর! তুই রাতারাতি ষে বিদ্যেসাগর হয়ে গেলিরে!” সকলে পরামর্শ করিলেন, এবার অবধি ইহাকে বিদ্যাসাগর নাম দেওয়া যাক। প্রথমে যুবকেরা তাহাকে অবিশ্রাতভাবে বিদ্যাসাগর বলিতে লাগিল; পরে বালকেরাও তাঁহাই ধীরল ; ক্ৰমে কত্তারা, মহিলারা, ধরিলেন। অবশেষে কম চারিবগা, দাসদাসী, পাড়াপ্রতিবেশী, সকলেই চন্দ্রমোহনকে বিদ্যাসাগর বলিতে লাগিল। পাঁচ সাত বৎসর পরে, তাহার পর্বনামের চিহ্নমাত্রও সে গ্রামে রহিল না; নবজাত বালকবালিকারা সে পুরাতন নামের কোন সংবাদই পাইল না। এইরপে কিছুকাল অতীত হইলে শিবদাসবাব একবার সপরিবারে কলিকাতায় আসিলেন। এখন “বিদ্যাসাগর” তাঁহার প্রধান পাচক, সেও সঙ্গে আসিল। প্রাতঃস্মরণীয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত শিবদাসবাবর সম্প্রীতি ছিল। কলিকাতায় আসার কিয়দিন পরেই, শিবদাসবাবর সাদর আহমানে তাঁহার আবাসে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শুভাগমন হইল। কত্তা গোপনে সকলকে সাবধান করিয়া দিলেনআজ আসল বিদ্যাসাগর আসিয়াছেন, খবরদার কেহ যেন আজ চন্দ্রকে বিদ্যাসাগর বলিয়া ডাকিও না। গহিণী ঠাকুরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া ক্ষুদ্রতম ভূত্য বালকটাকে পর্যন্ত শিবদাসবাব স্বয়ং বিশেষ করিয়া সাবধান করিয়া দিলেন। সকলে বিশেষ চেন্টা করিয়া কিছুক্ষণ চন্দ্রমোহনকে চন্দ্রমোহন বলিয়াই ডাকিল; কিন্তু শেষে আর রাখিতে পারা গেল না। বিদ্যাসাগর মহাশয় মাঝে মাঝে, এ ঘর ও ঘর সে ঘর হইতে “বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর" শব্দ শ্রবণ করিয়া চমকিয় উঠেন, তাহার অব্যবহিত পরেই শব্দ আসে, -“চােপ চাপ চাপ।” আবার শনিতে পান—“ও বিদ্যেসাগর। ডালে নন হয়নি কেন ?” “ও বিদ্যেসাগর! হাত চালিয়ে নাও না, হাঁ করে কি দেখছ!” “ও বিদ্যেসাগর! পায়েসটায় যে ধোঁয়ার গন্ধ বেরিয়েছে”—আবার সঙ্গে সঙ্গে শব্দ আসে—“চুপ চাপ চপ।” বিদ্যাসাগর মহাশয় ত কিছুই ঠিক করিতে পারেন না। লক্ষজায় কাহাকেও ಕಣ್ಗ ಕೌನ್ಜ পারেন না। অবশেষে এই মহাপরাষেরও লজ্জার বাঁধ ভাঙ্গিল।

  • කු ඕ