পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৩১৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কাজি সাহেব চক্ষ খলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি নাম বলিলে ?” “মাণেকচাঁদজনী।” পরিচয় কিছরই দেয় নাই। বলিল, সে বড় বিপন্ন, তাহার উপর অত্যন্ত বে-আইনি হইয়াছে—আপনি ধমাবতার, আপনার নিকট সে নিজ দুঃখ নিবেদন করিবে ।” “তা, এখানে কেন ? বিচারালয়ে, আমার পেস্কারের নিকট নিজ দরখাসত দাখিল করিতে বল ।” ভূত্য সবিনয়ে উত্তর করিল, “হজের, সে বলিল, তাহার যাহা বক্তব্য তাহা অত্যন্ত গোপনীয়, ধূমাবতার ভিন্ন অন্য কাহারও নিকট সে কথা সে প্রকাশ করিতে চাহে না । বড়ই কদাকাটা করিতেছে, তাহার উপর বড়ই জলম হইয়াছে।” কাজি সাহেব নীরবে আলবেলায় কয়েক টান দিয়া শেষে বলিলেন, “আচ্ছা, বৈঠকখানায় তাহকে বসাও, আমি ক্ষণকাল পরে আসিতেছি।” খানসাম সেলাম করিয়া প্রস্থান করিল। কাজি সাহেব কিছুক্ষণ আরমে ধুমপান করিলেন। তারপর উঠিয়া, ধীরপদে বাহির হইয়া বৈঠকখানাগহে প্রবেশ করিলেন । মাণেকচাঁদ বসিয়া ছিল, দাঁড়াইয়া উঠিয়া সসম্ভ্রমে কাজি সাহেবকে সেলাম করিল। “বৈঠিয়ে বৈঠিয়ে”—বলিয়া কাজি সাহেব নিজেও উপবেশন করিলেন। কাজে সাহেব দেখিলেন, লোকটির বয়স অনুমান পঞ্চাশ বৎসর, তাঁহার অপেক্ষা অন্ততঃ দশ বৎসরে বয়ঃকনিষ্ঠ । বেশবাস, ধনীজনোচিত নহুে—দরিদ্রেরই মত। জিজ্ঞাস: মাণেকচাঁদ বলিল, “আমি হজুরের নিকট ন্যায়-বিচার চাহি। গরীবের উপর বড়ই জলম হইযাছে।” “কি হইঘাছে খলিয়া বলন।” মাণেকচাঁদ তখন নিজ কাহিনী বলিতে আরম্ভ করিলঃ“হাজার, তিন চারি পুরুষ আমরা এই দিল্লী নগরীর অধিবাসী। পর্বেপুরুষদের আমল হইতেই আমাদের চিনির কারবার তাছে। পিতার মৃত্যুর পর আমিই সেই কারবারের মালিক হই,---কারণ আমিই আমার পিতার একমাত্র সন্তান ছিলাম। কারবার চালাইতে লাগিলাম। বিবাহ করিয়া সংসারধর্মও করিতে লাগিলাম। বেশ সুখেই কয়েক বৎসর কাটিল। কারবারটি আমি নিজে বড় দেখিতাম না। বালাকাল হইতেই ধমের দিকেই আমার আকষণ বেশী। টাকা পয়সার প্রতি কোনও দিনই নজর করি নাই। পুরাতন আমলের কমমচারীরা ছিল, তাহারাই দেখিত শনিত। আমি তাহদের উপরেই সমস্ত ভার দিয়া নিশিচন্ত মনে আপন সাধন-ভজন লইয়াই থাকিতাম। কিছুদিন পরে কবিতে ভাবিলাম, খাউক, আমি খাইতেছি, উহারা খাইবে না ? আমি বসিয়া খাইতেছি, উহারা খাটিয়া খাইতেছে—হয়ত, আমার চেয়ে উহাদের অভাব আরও বেশী। এই ভাবেই চলিতেছিল। হাজারের বোধ হয় সমরণ আছে, পাঁচ বৎসর পর্বে এই দিল্লী সহরে হায়জাবিমারীর (কলেরা) অত্যন্ত প্রকোপ হইয়াছিল। সে বৎসর হাজার হাজার লোক ঐ রোগে আক্ৰান্ত হইয়া মারা যায়। রামজীর কি মণ্ডিজ হইল, তিনি আমার স্ত্রী, পত্র, কন্যা-- সকলকেই আমার নিকট হইতে কাড়িয়া লইলেন !" এই পৰ্য্যন্ত বলিয়া মাণেকচাঁদ দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কাঁদতে লাগিল ! কাজে সাহেব বলিলেন, চাপ কর, চপ কর ভাইয়া;—আল্লা যাহা করিয়াছেন, শোক করিয়া তাঁহার কায্যের প্রতিবাদ করা তোমার উচিত নয়। চপ কর, চপ কর।” く》S