পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৩৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেখিতে দেখিতে বিবাহের দিন আসিয়া পড়িল। বরপক্ষীয়েরা পল্লীগ্রাম হইতে প্রভাতেই আসিয়া পৌছিলেন। তাঁহাদের জন্য কাছেই একটা বড় বাড়ী ভাড়া লওয়া ছিল, তাঁহারা সেইখানে উঠিলেন। বাড়ীতে সকলেই আনন্দ করিয়া বেড়াইতেছে, কেবল শৈলবালার মুখখানি মলিন। মাঝে মাঝে তাহার চক্ষ দুইটি জলে পরিয়া উঠিতেছে। তাহার আর সে পবেকার আকার নাই। যেন সে সম্প্রতি ছয় মাসের রোগশয্যা হইতে উঠিয়াছে। বেলা দশটার সময় গায়ে হলদে হইল। বরপক্ষীয়দের একটা দাসী গায়ে হলদের সময় বাড়ীতে আসিয়া পড়িয়াছিল। এত সাবধানতা সত্ত্বেও সে দেখিয়া গেল, মেয়ের একটি আঙ্গল কাটা। যথাসময়ে সে বরের পিতার নিকট গোপনে এ সংবাদ দিতে ভুলিল না। বরকত্তা শুনিয়া ত আশ্চৰ্য্য হইয়া গেলেন। তিনি নিজে পাজার সময় ময়েকে দেখিয়া আশীব্বাদ করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু হয়ত বাম হাতটা কাপড়ের ভিতর লকান ছিল, তাই কি অত লক্ষ্য করেন নাই ? যাহা হউক প্রিয়বন্ধ স্বনুদিরাম খড়ার সহিত অত্যন্ত গোপনে পরামর্শ অচিলেন, বিবাহের পৰেব কৌশলে এইটা জানাজানি করিয়া দিয়া, আরও দুই একশত আদায় করিয়া লইতে হইবে। সন্ধ্যা হইল। বিবাহের বাজনা বাজিয়া উঠিল। বর আসিয়া সভাপথ হইল। ইয়া গোঁফ-ইয়া চেহারা-পাড়ার ছেলেরা বরকে যে সকল ঠাট্টা বিদ্রপ করবে ভাবিয়া আসিয়াছিল, বরের গভীর মত্তি দেখিয়া সে সব কিছই করিতে সাহস করিল না। কিছুক্ষণ পরে কন্যাকত্তা যথারীতি গলবস্ত্র হইয়া সভায় নিবেদন করিলেন—’লগ্ন উপস্থিত, গাত্ৰোখান করিতে অনুমতি হউক।” বর গিয়া বিবাহ-মন্ডপে উপবেশন করিল। শ্যামাচরণ জামাতাকে বরণ করিবার উদ্যোগ করিতেছেন, এমন সময় বরকত্তা বললেন—“আমাদের একটা চিরকালের কৌলিক প্রথা আছে, তাহা পালন করিতে হইবে। কনেকে সভায় আনা হউক। বর কনের হাতে কিছ মিষ্টান্ন দিবে। তাহার পর বরণ হইবে।” - ইহা শনিয়া কন্যাপক্ষীয়রা নিজেদের পরোহিতের মুখপানে চাহিলেন। পরোহিত বলিলেন—“তাহাতে ক্ষতি নাই। যাহা উহাদের করিবার প্রথা আছে তাহা সবচ্ছন্দে করিতে পারেন। আমাদের তাহাতে আপত্তি কি ?” কনেকে আনা হইল। বরকত্তা বরের হাতে একটি সন্দেশ দিয়া বলিলেন—“এইটি তমি কনের হাতে দাও।” কনেকে বলিলেন—“মা লক্ষয়ী হাত পাত।” শৈল বন্দ্রাঞ্চলের মধ্য হইতে কম্পিত দক্ষিণ হসতখানি বাহির করিয়া দিল। বরকত্তা বলিলেন– “লা না, এক হাতে কি নিতে আছে মা ? দুইটি হাতই পাতিতে হয়।” শৈল ত কিছতেই বাম হস্ত বাহির করে না। শ্যামাচরণ দাঁড়াইয়া পলকে প্রলয় জ্ঞান করিতেছেন। অনেক পীড়াপীড়ির পর শৈলবাম হস্তখানি বাহির করিল। সকলেই দেখিল, মাঝের আঙ্গলটির আধখানা নাই। বরকত্তা বলিয়া উঠিলেন—“একি! অঙ্গহীন " পরোহিত ঠাকুর বললেন— "শ্ৰীগরে! অঙ্গহীনা কন্যা গ্রহণ করিতে শাস্ত্রে যে নিষেধ আছে! মখিয্যে মহাশয়, বিবাহ সৰ্থগিত করন।” বিবাহ স্থগিত করন । কন্যাপক্ষীয়েরা অতিশয় উষ্ণ হইয়া উঠিল। একজন বলিল —“কোথাকার অশাস্ত্রজ্ঞ ভট্টাচাৰ্য্য ! একটা আংগল কাটিয়া গেলে অংগহীন হয় একথা কোন শাস্ত্রে পড়িয়াছেন ?” ভট্টাচাৰ্য্য অশাস্ত্রজ্ঞ ! ভট্টাচাৰ্য্য কোন শাস্ত্রে পড়িয়ছেন! তিনি অগ্নিশম্মী হইয়া বলিলেন–“কৈ হে বেল্লিক অকালকুমাণ্ড, আমার চেয়ে তোমার শাস্ত্রজ্ঞান অধিক নাকি ?” শ্যামাচরণ প্রমাদ গণিয়া বললেন—“আপনারা যদি এখন বিবাহ পথগিত করেন, তাহা হইলে আমার জাতি থাকে কেমন করিয়া ?” ఖ2ళ