পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৪৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


এখানকার মধ্যবিত্ত গৃহস্থ, কিন্তু শনা যায় নাকি বন্ধ নবীনের হাতে নগদ দশ হাজার -- টাকা আছে। কেহ বলে ইহা বাজে গজেব, কেহ বলে ইহা সত্য কথা; কিন্তু কেহই সে টাকা সবচক্ষে দেখে নাই। সে টাকা যে লোহার সিন্দকটিতে আছে অথবা নাই, সেই সিন্দকটিমাত্র সকলে দেখিয়াছে। সেটি বন্ধের শয়নকক্ষে অবস্থিত। বন্ধ সর্বদাই সেই ঘরে থাকিয়া সিন্দকটি আগলাইয়া থাকিতেন। তাঁহার পত্র নবকুমার পশ্চিমে চাকরি করে, সে অনেকবার পিতাকে স্বীয় কৰ্ম্মপথানে লইয়া যাইবার চেষটা করিয়াছে, কিন্তু বদ্ধ কখনও যান নাই। সকলে বলে, তিনি সিন্দকটি ফেলিয়া যাইতে পারেন না। গগন চক্ৰবত্তীর্ণ বসিয়া নীরবে তামাক খাইতে লাগিলেন। কুমে ডাক্তারবাবরে লন্ঠনের আলো উঠানে পড়িল। ডাক্তারবাব আসিয়া বারান্দার নিনে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করলেন, “চক্লবত্তী মশাই । খবর কি ?” চক্লকত্তী হকাটি নামাইয়া বলিলেন, “ডাক্তারবাব ? এস, খবর ভাল! এখনও বেহুস রয়েছেন—বড় জবরটা রয়েছে কিনা। কিন্তু নাড়ী বেশ চলছে এখনও ! উঠে এস—একবার দেখ না।” ডাক্তারবাব উঠিয়া আসিলেন। চক্লবত্তী হকাটি সযত্নে দেওয়ালে ঠেস দিয়া রাখিয়া দবার খলিরা রোগীর কক্ষে প্রবেশ করিলেন। ডাক্তারও তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রবেশ । করিলেন। পিলসজের উপর একটি মাটির প্রদীপ লানভাবে জলিতেছিল। একখানি লম্বা ও চওড়া তক্তপোষের উপর মলিন শয্যায় শয়ন করিয়া বন্ধ রোগী নিদ্রা যাইতেছেন। তাঁহার পদতলে বসিয়া তাঁহার পত্রবধ সাবিত্রী পায়ে হাত বলাইতেছে। ইহাদের প্রবেশ করিতে দেখিয়া সাবিত্রী ঘোমটা টানিয়া দিল। গগন চক্লবত্তী প্রদীপটা একটা উত্তজবল করিয়া দিলেন। ডাক্তার বন্ধের নাড়ী পরীক্ষা করিলেন— থাৰ্ম্মমিটার দিয়া উষ্ণতা লইলেন। পরীক্ষাতে বললেন, "এখনও খাব জার। সে ফিবার মিক্চারটা খাওয়ান হচ্চে?” সাবরী ঘোমটাবত মস্তক সঞ্চালন করিয়া জানাইল হইতেছে। ডাক্তার বলিলেন, “আজ সারারাত্রি ওটা দেওয়া হোক। ভোরের দিকে রিমিশন হবার সমভাবনা ৷” বলিয়া ডাক্তারবাব বাহিরে আসিলেন। গগনচন্দ্রও তাঁহার সহিত দরজা অবধি যাইলেন। ডাক্তারবাব জিজ্ঞাসা করিলেন, “নবকে খবর দিয়েছেন ?” “না, দিইনি। কিছ ভাবনা নেই, দাদা ভাল হয়ে উঠবেন। ওরকম ত হয়ই ওঁর মাঝে মাঝে। নবীকে খবর দিলেই এখনই খরচপত্র করে বাড়ী আসবে—তাই খবর দিইনি।” ডাক্তারবাব বললেন, “গতিক বড় ভাল বোধ হচ্চে না কিন্তু। আজ পাঁচ-পাঁচ দিন জম্বরটা ছাড়ল না—ভারি দলবল হয়ে পড়েছেন। জবর ছাড়বার সময় সামলাতে পারলে হয় !" -: গগন বলিলেন, “আরে না না। আমি এতকাল দেখেছি। কিছ ভয় নেই।” “দেখা যাক। অনেক বয়সটা হয়েছে কিনা, তাই ভয় হয়।”—বলিয়া ডাক্তারবাব মদমন্দপদক্ষেপে প্রস্থান করিলেন। ডাক্তারবাবর কথাই সত্য হইল—ভোরবেলায় প্রাণপাখী বন্ধের দেহfপঞ্জর ছাড়িয়া গেল। মৃত্যুর পরে দই এক মিনিটের জন্য মাত্র তাঁহার চেতনা হইয়াছিল। তখন তিনি শুধু বলিয়াছিলেন, "নব-নবমীঃ এসেছে ?” বাড়ীতে কুন্দনের রোল উঠিলে, পাড়ার লোক দুইটি একটি করিয়া আসিয়া সমবেত হইতে লাগিল। সকলেই বলিল, “তা বেশ গেছেন, খুব গেছেন। বয়স হয়েছিল—তোমাদের সব রেখে গেছেন—এ ত ওঁর সৌভাগ্য। তবে নব কাছে থাকলেই ভাল হত।" ২১২