পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আমার পিতামাতার মাথায় বজ্রপাত হইল। তাঁহারা সকলে হাঁ হাঁ করিয়া কীলকাতায় দাদার বাসায় গিয়া পড়িলেন। কান্নাকাটি করিয়া আত্মহত্যা করিবার ভয় দেখাইয়া দাদাকে বাড়ীতে আনা হইল। ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয় তকে দাদাকে পরাজিত করিবার জন্য নবদ্বীপ হইতে একযোড়া অধ্যাপক আমদানী করা হইল। ব্রাহ্মধৰ্ম্মদ্বেষী যত কিছু পতেকপুস্তিকা ছিল, সে সব কলিকাতা হইতে আসিল। ক্ৰমে দাদা ব্রাহ্মধৰ্ম্মম গ্রহণ করিবার অভিলাষ ত্যাগ করলেন বটে, কিন্তু ব্রাহ্ম হইতে না পাইয়া ক্ৰমে কর্ণেল অলংকটের শিষ্য হইয়া পড়িলেন। দাদা বড় বড় নখ রাখিলেন, বড় বড় চলে রাখিলেন মাছ মাংস ছাড়িলেন, আতপ চাউল ধরিলেন;–এমন কি সন্ধ্যাহিক না করিয়া আর জলগ্ৰহণ পৰ্যন্ত করেন না। যখন দাদা আমায় লেখাপড়া শিখাইবার ভার লইলেন, তখন তিনি ঘোর বিয়জফিস্ট। মনে আছে, বিবাহ করিবার জন্য. মা কত সাধ্যসাধনা করিতেন--দাদা বলিতেন—“মহাত্মাগণের ইচ্ছা নয় যে আমি বিবাহ করে সংসারজালে জড়ীভূত হয়ে পড়ি।” গ্রামের যবকদিগের মধ্যে দাদার একটি ভক্ত-সম্প্রদায় ছিল, তাহারা গোপনে যার তার কাছে বলিয়া বেড়াইত, হিমালয়ের গৃহায় শত সহস্ৰ বৎসর বয়স্ক মহাত্মারা আছেন, তাঁহারা দাদাকে মাঝে মাঝে পত্রাদি লিখিয়া থাকেন। দাদার উপর আমার ভক্তি এত বেশী ছিল যে, তিনি বলিলে আমি মরিতে পর্যন্ত পরিতাম। দাদা যখন একান্তে বসিয়া আমাকে পড়াইতেন, তখন মাধনেত্রে আমি তাঁহার প্রতিভায় সমাজৰল মাখের পানে চাহিয়া থাকিতাম। এমন দাদার সহোদরা ভগ্নী আমি, —নিজেকে ধন্য মনে করিতাম। দাদা আমাকে উপদেশ দিতেন, বিশ্বজগৎ মায়ারচনা, সংসার কারাগার, আত্মীয় পরিজনের প্রতি নেহভালবাসা জীবের মক্তির প্রধানতম অন্তরায়। দাদা নিজের উপদেশবাক্য রামায়ণ মহাভারত খালিয়া সপ্রমাণ করিতেন। যখন আমি এগারো বৎসরে পড়িলাম, তখন দারুণ শোক পাইলাম। ছয় দিনের জবরবিকারে বাবা মারা গেলেন;–দুইটি মাসও পোহাইল না, সতীলক্ষসী মা-ও তাঁহার স্বামীর পদানসরণ করিলেন। দই মাসের মধ্যে বাপ মা দই হারাণো:—যাহার এমন হইয়াছে সেই জানে। দাদা না থাকিলে কি সেই বয়সে সে শোক আমি সহ্য করতে পারিতাম ! দাদা এই সময়ে আমাকে গীতা পড়াইতে লাগিলেন। সংস্কৃত জানিতাম না, তব শেলাকগলি মুখস্থ করিতাম। বাঙ্গালা অনুবাদ পড়িতাম। দাদা টীকা টিপনী করিয়া সুন্টু ফল দিতেন। শোকদগধ হৃদয়ে গীতার শেলাকগুলি যেন অমতসিঞ্চন রত । যখন বারো বৎসরের হইলাম তখন আমার বিবাহের কথাবাত্ত উঠিল। বড় দাদা মেজ দাদা সপরিবারে বিদেশে থাকিতেন—তাঁহার ছোট দাদাকে চিঠির উপর চিঠি লিখিতে লাগিলেন—হাঁরর বিবাহের বন্দোবসত কর, আর বিলম্ব করিও না । দাদাকে প্রার্থনা জানাইলাম, আমি বিবাহ করিব না; ধম্মালোচনায় কুমারী-জীবন যাপন করিব। - দাদা না-হু-না-হয় ভাবে কিছুদিন কাটাইলেন। শেষে যখন বড় দাদার তাঁহাকে কড়া কড়া চিঠি ঝাড়িতে আরম্ভ করিলেন তখন দাদা পাত্র সন্ধান করিতে বাহির হইলেন। আমাকে বঝাইলেন, বিবাহ করিলেই যে ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মম সব নাশ হইয়া যায় তাহার কিছু মানে নাই। বরং সংসারাশ্রমে থাকিয়া ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম অক্ষণ রাখতে পারলেই বেশী প্রশংসার বিষয়। দাদা যখন এ কথা বলিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করিব না কেন ? বলিলাম— “আপনার আজ্ঞাই শিরোধাষা ।” - - - কয়েকটা সম্মবন্ধ ভাঙ্গিয়া একটা স্থির হইল। পাত্র জামালপরে রেলওয়ে আফিসে কম করেন। প্রথম পক্ষের বিবাহ বটে;–কিন্তু একটু বয়স হইয়াছে। বৎসর প’চিশের কম নহে। তিনি স্বয়ং আমাকে দেখিতে আসিবেন লিখিলেন 8&