পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৫৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


স্বয়ং একখানি রাখলেন, আমাকে একখানি দিলেন। পজোকালে সেখানিকেও রীতিমত পজো করিতাম। বেশ দিন কাটিতে লাগিল । আশিবন মাসে আমার স্বামী দাদাকে পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন–ছটিতে আসিয়া বিজয়াদশমীর দিন আমায় লইয়া যাইবেন । শ্বশুরবাড়ীতে গিয়া কেমন করিয়া পড়াশনা হইবে পজোচ্চনাই বা কেমন করিয়া হইবে ? বড় ভাবনা হইল। যাহা হউক, ইহার জন্য পৰবৰ্ণবাঁধই প্রস্তুত ছিলাম। ভাবনা যাদাশীষস্য সিদ্ধিভাবতি তদশীঃ । তবে আমার বিঘাশঙ্কা কোথায় ? নিদিষ্টট দিনে দাদার চরণে প্রণাম করিয়া অশ্রাহীন চক্ষে সবামীর সহিত গাড়ীতে উঠিলাম। দাদাকে অনেক করিয়া বলিয়া গেলাম, যদি গরদেব আসেন তবে অবশ্য অবশ্য আমাকে গিয়া লইয়া আসিও। আমার স্বামী আমাকে লইয়া একেবারে জামালপরে উপস্থিত হইলেন। শ্বশ্ৰাদেবী মিট কথায় আমাকে সাদর সম্ভাষণ করিলেন। যে স্থানে আমাদের বাসা, তাহাকে বৈদ্যপাড়া বলে। জানালা খলিলে আধ মাইল দরে পাহাড় দেখা যায়। বৈদ্যপাড়ায় সবই বাংগালী;—শুনিলাম জামালপরময় সবই বাংগালী ! হিন্দুস্থানীর সংখ্যা জামালপরে মাটিমেয়। হিন্দন্থানী যত, তাহারা সব জামালপরের বাহিরে আশেপাশে পল্লীগ্রামে থাকে। জামালপরে সমস্তই আফসের বাবা। নয়টা হইতে চারিটা পয্যন্ত জামালপরসদ্ধ বাব আফিসে আবদ্ধ থাকেন, সতরাং ঐ সময়ের জন্য জামালপারটা সত্ৰীলোকের, রাজ্য হইয়া দাঁড়ায়। মেয়েরা সম্পণে স্বাধীনতার সহিত প্রকাশ্য রাজপথ অতিক্ৰম করিয়া এবাড়ী ওবাড়ী করিয়া বেড়ায়। প্রয়োজন হইলে দল বাঁধিয়া এপাড়া ওপাড়া করাও চলে। এইটি জামালপরের সরীসমাজের বিশেষত্ব। বঙ্গদেশের বাহিরে আর কোথাও সন্ত্রীলোকদের এ সুযোগ নাই। অন্যের পক্ষে ইহা যতই সুবিধাজনক হউক, আমার মহা বিপদ হইল। সাড়ার লোকে দলে দলে আমাকে দেখিতে আসিতে লাগিল। আমার সবন্ধুে যে সব সমালোচনা হইতে লাগিল, সেগল তাহারা আমার অসাক্ষাতে করার শিষ্টাচার পর্যন্ত দেখাইল না। আমি আসঙ্কোচে সরলভাবে তাহাদের প্রশ্নের উত্তর করিতাম, প্রতিফলসবরপে কেহ আমাকে বেহায়া বলিত, কেহ বলিত দেমাকে, কেহ বলিত কিছল। কুমে । ক্ৰমে আমার বিরক্তি ধরিয়া গেল। আমার পড়াশনা পজাচ্চনার অত্যন্ত ব্যাঘাত হইতে লাগিল । তাহারা আসিলেই আমি লেপ-মুড়ি দিয়া শইরা পড়িতাম ! হাজার ডাকাডাকি করিলেও উত্তর দিতাম না। তাহারা আমার প্রতি চোথা চোখা বাক্যবাণ প্রয়োগ করিয়া আমার ঘর ছাড়িয়া যাইত। বাড়ী ছাড়িয়া যাইত না, তাহ হইলে ত বাঁচিতাম। কখনও বারান্দায় কখনও উঠানে পেয়ারা গাছের ছায়ায় বসিয়া জুটলা পাকাইত। তাহারা চলিয়া না গেলে আর আমি বিছানা ছাড়িতাম না। বাশড়ী মাঝে মাঝে আমাকে বলিতেন—“বাছা, ওরা সব তোমায় দেখতে আসে, তুমি মাথাঠারোপনা করে বিছানায় পড়ে থাক, ওঠ না, কথা কও না, দেখতে কি সেটা ভাল হয় ? ভারি সবাই নিন্দে করে ” মাকে আমি কিছু বলিতাম না, ভাবিতাম ভাল হয় না ত হয় না, নিন্দা করে ত করে। এরপ অলস নিন্দার ভয়ে কি আমি ভীত হইব ? তাহা হইলে আমি ঐ শত সহস্র সাধারণ সত্ৰীলোকের সাগরে জলবিন্দর মত মিশাইয়া যাই না কেন ? তাহা ছাড়া আরও একটা কারণ ছিল । সমস্ত দিন আমার প্রজা ও শাস্ত্রচচ্চা কিছুই হইত না;–রাত্রে আমাকে সে সব করিতে হইত। রাত্রি দুইটা তিনটা পৰ্য্যন্ত জাগিতাম। সতরাং দিবানিদ্রা ভিন্ন উপায় ছিল না। প্রতিবেশিনীরা আমার বিরুদ্ধে আমার বাশুড়ীর নিকট নানাপ্রকার অভিযোগ করিয়া আমার বিপক্ষতাচরণ আরম্ভ করিল। আমি যে তাহদের সঙ্গে সংস্রব মাত্র রাখিতে স্বীকৃত হইলাম না, ইহাই তাহদের চক্ষে আমাকে মহা অপরাধে অপরাধিণী করিল। তাহার্য যত আমার অনিস্ট চেণ্টা করিতে লাগিল, আমি তত তাহাদিগকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতে লাগিলাম। 8יש - -