পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


নানা কারণে আমি লোকের বিরাগভাজন হইতে লাগিলাম। আমার শবাশড়ীর নিকট তাহারা শুনিয়াছিল যে আমি সব্বদা পড়াশনা করি। দই চরিজন নবীনা, নাটক নভেলের দরাশায় আমার সঙ্গে ভাব করিল। একজন আসিয়া একদিন বলিল,-“বউ, তোমার কাছে নাকি সব অনেক ভাল ভাল বই আছে, কি কি বই দেখাও না ভাই।” আমি মনে মনে হাসিয়া বাক্স হইতে দই চারিখানি বহি বাহির করিয়া দেখাইলাম । বুইগলি সে নাড়িয়া চড়িয়া দেখিল. দেখিয়া বলিল—“এই বই তুমি পড় ?” আমি বললাম—“পড়বার জন্যেই ত এনেছি।” “এ যে শাসত্র।” “শাস্ত্র কি পড়তে নেই ?” “পড় ভাই। আমরা মুখ্য সংখ্য মেয়েমানুষ।”—হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম— “আমি কি পরষমানুষ নাকি ?” বলিয়া বহি তুলিয়া রাখলাম। ঐ যে একটন হাসিলাম, তাহাতেই বোধ হয় সখী মনে করিলেন, আমি তাঁহাকে অপমান করিলাম। যাহা হউক তিনি অভিমানে গস গস করিয়া চলিয়া গেলেন। আমার সঙ্গে যাহাদের আলাপ হইত, বারান্তরে দেখা হইলে তাহাদের সকলকে চিনিতে পারিতাম না। কে আত মনে করিয়া রাখে বাপ ! ইহাও আমার প্রতি তাহাদের ক্লোধের সঞ্চার করিল। কেহ কেহ আমাকে শনাইয়া শনাইয়া বলিত—“তা হোক বড় মানুষের মেয়ে, তাই বলে কি আমনিই করতে হয় ? আমি কি ওঁর বারস্থ হতে গিয়েছিলাম যে আমাকে চিনতে পারলেন না ?” এই সকল ত্রটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা আমি আবশ্যক বোধ করিতাম না। তাহারাও তিল তিল করিয়া আমার বাঁশড়ীর মন বিষাক্ত করিয়া প্রতিশোধ লইতে লাগিল। শবাশুড়ী আমায় মাঝে মাঝে একটু আধট ভৎসনা আরম্ভ করিলেন। ব্রমে রুমে সর উচ্চ হইতে উচ্চে উঠিল। কিন্তু আমি তাঁহার ভৎসনায় দঃখিত বা বিরক্ত হইতাম না; বোধ হয় সেই কারণে তাঁহার ক্রোধও উত্তরোত্তর বন্ধি পাইয়া চলিল। নিজমুখে নিজদোষের কথা বলিতেছি, রাখিয়া ঢাকিয়া বলিবার প্রয়োজন নাই। মনের ভাব যেমন যেমনটি হইয়াছিল, তেমনি বলিয়া যাইতেছি। আমার বলিবার ভংগী দেখিয়া যেন তোমরা আমাকে ভুল বুঝিও না;–যেন মনে করিও না যে, আমার ভাবখানা—দেখ দেখি আমি কেমন বাহাদরী করিয়াছিলাম ! আমি যাহা করিয়াছিলাম, তাহা অতি গাঁহাত কাৰ্য্য করিয়াছিলাম, কিন্তু তখন মনে হইত বঝি ভারি বীরত্ব করিতেছি। আমার স্বাশুড়ী বালবিধবা। চিরদিন পাঁচটার সংসারে খাটিয়া খাটিয়া পরের মন যোগাইতে যোগাইতে তাঁহার প্রাণ ওষ্ঠ্যগত হইয়াছিল। কেবল ছেলেটিকে মানুষ করিবার জন্যই না ? সেই ছেলের বউ আসিল—কত সাধের বউ—তিনি মনে ভার আশা করিয়াছিলেন, বধর হাতে সংসারের ভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইবেন, বসিয়া আপনার হরিনাম করবেন। বধ যে সমস্ত রাত্রি ধরিয়া পাজা করিবে আর গীতা মুখস্থ করিবে, আর সমস্ত দিন লেপমঁড়ি দিয়া ঘুমাইবে, তাহা তিনি সবপ্নেও ভাবেন নাই। অনেক দিন হইতে প্রথা আছে, ছেলে বিবাহ করিতে যাইবার সময় মা জিজ্ঞাসা করেন—“বাবা তুমি কোথায় যাইতেছ?” ছেলে বলে—“মা আমি তোমার জন্য দাসী আনিতে যাইতেছি।” স্কুলের পণ্ডিত মহাশয় একালের বধ্যগণের গণকীৰ্ত্তন করিবার সময় বলেন যে, ঐ উত্তর পরিবত্তন করিয়া এখন বলা উচিত—“ম: তোমার মােসর আনিতে যাইতেছি।”—আমার শবাশুড়ীর পক্ষে আমি ঠিক মগের হই নাই বটে, কিন্তু দাসী যে হই নাই তাহা নিঃসন্দেহ । বরং তিনি দাসীর মত আমার সেবা করিতেন। লিখিতে লজজা করিতেছে—কত দিন হয়ত দাই আসে নাই, আমার ছাড়া কাপড় পর্যন্ত মাকে কাচিতে হইয়াছে। আমি কি যে ভাবিতাম, কি অহঙ্কারে যে মত্ত থাকিতাম, তাহা বলিতে পারি না। বাশুড়ী যে আমাকে ভৎসনা করিতেন, তাহার জন্য 6-98 8?