পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৬৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চাহিতেছিল। বোধ হয় ভাবিতেছিল, বড় নিশ্চয়ই তামাক চাহিবে, এবং তামাক সাজিতে গিয়া নিশ্চয়ই সেও দটান টানিয়া লইবে। বেচারী নতন তামাক খাইতে শিখিয়াছিল, ধমপিপাসাটা তখন তাহার অত্যন্ত বলবতী। কিন্তু সীতানাথের দটি তাহার উপর পতিত হইবামাত্রই বলিলেন—“ওহে বাবকে একবার খবর দাও, নগাঁয়ের সাতেনাথ মখায্যে এসেছেন।” আশাহত বালক এ অনুরোধে বাক্যমাত্র ব্যয় না করিয়া নীরবে আগন্তুকের প্রতি একবার চাহিল। গম্ভীরভাবে কাস্তেথানি বেড়ার গারে ঝালাইল । দড়ির তালটা ধীরে ধীরে গটাইয়া ভাল যায়গায় রাখিল । তাহার পর অপ্রসন্নমুখে মন্থরপদে অতঃপরে প্রবেশ করিল। অনতিবিলম্বে হবেীকেশ আধময়লা ধতি পরিয়া, একটা মোটা চাদর গায়ে দিয়া, বাহির হইয়া আসিলেন। সীতানাথ দেখিলেন, বৈবাহিকের সে স্থলবপ নাই, অঙ্গে সে লাবণ্য নাই, চক্ষ কোটরগত। দুইজনে নমস্কারের আদান প্রদান হইল, কোলাকুলি হুইল, কুশলপ্রশনাদি জিজ্ঞাসা হইল। হৃষীকেশের চক্ষু ছলছল; গোটাকত বড় বড় ওঠেবিদ গণ্ড বহিয়া তাঁহার গান্ধবস্ত্রে পতিত হইল। ভূত্য আসিয়া তামাক দিয়া গেল! দুইজনে অনেকক্ষণ ধরিয়া পৰ্য্যায়ক্ৰমে ধর্মপান কয়িলেন, কাহারও মুখে কথাটি নাই। - অবশেষে সীতানাথ বলিলেন—“ভাই, যাহা হইবার তাহা ত হইয়াছে, সে ত আর ফিরিবে না, ব্যথা আক্ষেপ করিয়া কি হইবে বল ? মেয়েটিকে একবার আন দেখি।” হষীকেশ উঠিয়া গেলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে বাহির হইয়া আসিলেন। পশ্চাতে ঝি, তাহার কোলে ফরাসী ছিটে দোলাই জড়ান, মাতৃসতনবঞ্চিত শীর্ণকায় শিশুকন্যা। সে হাসিতেছে না, কাঁদিতেছে না, নিতান্ত নিলিপ্তের মত একদিক পানে চাহিয়া আছে । তাহার পিতামহ তাহার মুখ দেখিবার জন্য নগদ একটি আধলি বাহির করিয়াছিলেন। কি ভাবিয়া আবার আধলিটি রাখিয়া একটি টাকা বাহির করিলেন। মনুখযে মহাশয় ইহজীবনে এরূপ বদান্যতা ও ত্যাগসবীকারের পরিচয় আর কখনও দেন নাই—এবার একট বিশেষ কারণ ছিল। টাকাটি দিয়া নাতিনীর মুখ দেখিলেন। ঝি টাকাটি হাতে লইয়া অসন্তুটের মত অন্যদিকে মুখ ফিরাইল। বলা বাহুল্য, মেয়ের আদর এখন সহর ছাড়িয়া পল্লীগ্রামেও প্রবেশ করিয়াছে। কলেজের নব্যবাব *বশরোলয়ে গিয়া, গিনি দিয়া প্রথম কন্যার মুখ দেখিলে, পাড়ার লোকে সেটাকে বাড়াবাড়ি বলিয়া আর হাস্য করে না। সুতরাং টাকাটি ঝির মনে ধরিবে কেন ? সে ভাবিল “মর মিনষে, এত কটের প্রথম মৈয়েটি,—আহা, তাতে আবার মা-মরা–একট সোণা ইrটল না মুখ দেখতে " - ক্ৰমে অন্ধকার হইল। মুখোপাধ্যায় হস্তপদাদি প্রক্ষালন করিয়া সন্ধ্যাবন্দনার জন্য বাটীর ভিতর প্রবেশ করিলেন। পাজার আসনে বসিবামাত্র শনিতে পাইলেন, তাঁহার বেহাইন, “ওগো মা আমার কোথায় গেলিগো” বলিয়। উচ্চস্বরে কুন্দন আরম্ভ করিয়াছেন । মাতৃহদয়ের সেই উচ্ছসিত শোকান্তরবে সন্ধ্যাদেবী যেন শিহরিয়া উঠিলেন। হৰ্ষীকেশের চক্ষ হইতেও ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। সাঁতানাথ মঢ়ের মত পাজার আসনে বসিয়া রহিলেন। মধ্যে মধ্যে কেবল মাথা নাড়িয়া যলিতে লাগিলেন—“হা নারায়ণ, কি করলে ?” কান্না থামিলে সীতানাথ সন্ধ্যাহিক শেৰ করিলেন । তাহার পর জলযোগে বসিলেন । কিন্তু তাঁহার মনের ভিতরটা কে যেন টিপিয়া ধরিয়া থাকিল। যে কাযের জন্য এতখানি গওগাপথ অতিক্ৰম করিয়া আসিয়াছেন, তাহার সম্বন্ধে ত এখন পর্যন্ত একটি কথাও বলা হইল না। বৈকাল হইতে কতবার বলি বলি করিয়া আর বলিতে পারেন নাই। শেযকালে সিথর করিলেন-“দব হোক গে, কাল সকলেই বলব, রারিটা কোন মতে কুটিয়ে দিই ৷’’ । @ー