পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৬৮০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জন্য তাহারা কত না কাঁদাকাটি করিতেছে। তাহার স্ত্রীর জন্যও দুইটি গাব সে রাখিয়া আসিয়াছিল, সে দুটি হতভাগিনী খাইয়াছে কি ? এসকল কথা ভাবিতে ভাবিতে বাইচরণের কোটরগত চক্ষু ছল ছল করিতে লাগিল । অথচ চিরদিন তাহার এ অবস্থা ছিল না। রাইচরণের পিতা কৃষ্ণদাস বসাক একজন সম্পন্ন গহস্থ ছিল। তাহার পাকা বাড়ী ছিল, পঙ্করিণী ছিল, একশত বিঘা ধানের জমি ছিল। গহে অনবরত দশখানা তাঁত চলিত—বেতনভোগী ভূত্যেরা সে তাঁত চালাইত । কৃষ্ণদাসের জীবিতকালেই ম্যাঞ্চেস্টারের কৃপায় অধিকাংশ তাঁত বন্ধ হইয়া গিয়াছিল বটে, কিন্তু তথাপি গহে কখনও অন্নাভাব হয় নাই। এমন কি বংশানুক্ৰমে যে সকল প্রজাপারণ চলিয়া আসিতেছিল, তাহাও নিববাহিত হইত। রাইচরণ সাবালক হইবার পরেই তাহার পিতার মৃত্যু হয়। সে আজ পাঁচশ বৎসরের কথা। এখন আর তাহার সে পাকা বাড়ী নাই—সংস্কারাভাবে ইষ্টকের ভবনস্তপ হইয়া পড়িয়া আছে। তাহারপাশেই রাইচরণ মত্তিকার কুটীর তুলিয়ছে। সে একশত বিঘা জমির মধ্যে তিন চারি বিঘা মাত্র অবশিষ্ট আছে—বাকী সমস্ত ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয় নিলামে খরিদ করিয়া লইয়াছেন। বাগান, পাকুর সমস্তই ঐরপে ভট্টাচায্যের করকবলিত হইয়াছে। একদিনে নহে—একবারে নহে। ক্ৰমে ক্ৰমে-অম্পে অপে। বিপদের সময় ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয়ই রাইচরণের একমাত্র বন্ধন হাত পাতিলেই কাজ দিতেন। সদটা কিছ উচ্চহারেই লেখাইয়া লইতেন। রাইচরণ তজন্য তাঁহাকে অন্যযোগ করলে বলিতেন—“বাপ হে, আমিও ছাঁপোষা মানুষ। ওর কমে দিতে গেলে আমার সংসার চলে কেমন করে বল?”—কিন্তু দশটাকা কােজ লইখা বৎসর দুই তিন পরে, দেড় শত টাকার একতফা ডিক তাহার নামে কেমন করিয়া হইত, তাহা রাইচরণ মোটেই বঝিতে পারিত না। জিজ্ঞাসা করিলে ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয় বলতেন -“ইংরাজের আইন আদালত বড় শস্তু ব্যাপার—কি থেকে যে কি হয়, ও কিছর বোঝবার যো নাই। আমরা আগম নিগম তত্ব পরাণ সবই ড পড়েছি—তর আমাদেরই বক্সতে মাথা ঘরে যায়: তুমি ত তাতির ছেলে জাত-বোকা ।” রৌদ্র ক্ৰমে নিবিয়া গেল। হাট ভাঙ্গিতে আরম্ভ হইল। যাহাঁদের দরে যাইতে হইবে, তাহারা আর থাকিতে পারে না। ময়রাব দোকানে দুই এক পয়সার জল খাইয়া তাহারা সব সব গ্রামাভিমুখে পদচালনা করিল। হাটের চারিখাশে অনেকগুলি পথায়ী দোকান। মনোহারী দ্রব্যের দোকান, মদীর দোকান, কাপড়ের দোকান। ঐ যে সৰবৰ্ণপেক্ষা বৃহদায়তন কাপড়ের দোকানখানি দেখা যাইতেছে, উহাই ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের। ওখানেও এখন আর তেমন ভিড নাই। কেবল দই চারিজন চাষীলোক, লাট-মাকা ও বলদ-মকা বিলাতী ধতির জমি ও মল্যের তারতম্য পৰ্যালোচনা করিয়া, কোনখানা কিনিবে কিছই ঠিক করিতে পারিতেছিল না। অবশেষে বস্ত্র বিক্রয় সম্বন্ধে হতাশ হইয়া রাইচরণ উঠিয়া পড়িল । সিথর করিল, ভট্টাচাযৰ্ণ মহাশয়ের দোকানেই দুই জোড়া দিবে। বলিয়া কহিয়া আক্ত নগদ মলাটা চাহিয়া লইবে । ভট্টাচায্যের দোকানে কাপড় দেওয়া ব্ৰাইচরণ মোটেই পছন্দ করিত না । হাটের খরিদ্দারের নিকটে যে মাল্য পাওয়া যায়, ভট্টাচাযৰ্ণ তাহা দেন না। তাহাও নগদ মহেঁ। বিক্রয় করিয়া মাল্য দিয়া থাকেন। একটা ধারাবাহিক হিসাব চলিয়া আসিতেছে । মল্য বাবদ যত টাকা পাওনা আছে বুলিয়া রাইচরণ মনে মনে হিসাব করিয়া রাখিত, খাতা দলেট ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয় তদপেক্ষা অনেক কম বলিতেন। প্রতিবাদ করিলে উত্তর দিতেন — বাপ হে, আমার পাকা খাতায় লেখা রয়েছে, তুমি বললেই হবে ? জান ত কথাই আছে, লেখার কড়ি বাঘে না খায়।--নিতান্ত দায়ে না ঠেকিলে রাইচরণ তাঁহার দোকানে কাপড় দিত না । গামছা জড়ান ধতি বগলে করিয়া সে যখন দোকানে প্রবেশ করিল, ভট্টাচাৰ্য্য তখন হ:কা হাতে করিয়া তহবিল বাক্স সম্মখে রাখিয়া পাকা খাতা “দটি" করিতেছিলেন। রাইচরণ প্রপাম করিয়া বলিল—“দাদাঠাকুর, দর ཨ་ཀྱཱ་ ধতি এনেছি—নিতে হবে।" 6.