পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৭৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ব্যবহার করিতে ইচ্ছা করি—ধরন আমার নাম শ্ৰীমনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি একখানি মাসিক পত্রিকার মালিক ও সম্পাদক—আমার কাগজখানির নামও গোপন করিয়া তৎস্থলে লিখি—“আৰ্য্যশক্তি"। এই কপটতাটুকু অবলম্বন করিলাম বলিয়া পাঠকবগের নিবট করযোড়ে ক্ষমাভিক্ষা করিতেছি। কারণ অদ্য যে আত্মকাহিনীটি বিবত করতে বসিয়াছি তাহাতে আমার বৃদ্ধিমত্তা, শৌয্য, বীৰ্য্য প্রভৃতি গুণাবলীর বিশেষ কোনও পরিচয় নাই —বরঞ্চ তবিপরীত। আমার আসল নামটি শনিলে আপনারা অনেকেই হয়ত আমাকে চিনিয়া ফেলিবেন; কারণ আমি বঙ্গসাহিত্যে একজন নগণ্য ব্যক্তি নহি, এবং আমার কাগজথানিরও যথেস্ট নাম হইয়াছে। কিন্তু বৰ্ত্তমান বংগ-সাহিত্যের দভাগ্য এই যে, নাম যত হয়, টাকাকড়ি তাহার উপযুক্ত কিছুই হয় না। সমখেই পজা প্লেসের দেন শোধ করিতে হইবে, কাগজের দোকানেও অনেক টাকা বাকী, যে ফারম আমাদের ছবির ব্লক প্রস্তুত করে, তাহারাও তাগাদায় অথির করিয়া তুলিয়াছে। অথচ তহবিলের অবস্থা শোচনীয়। তাই, ভাবিয়া চিন্তিয়া, রঙ্গীন কাগজে এক লবা চৌড়া হ্যাণ্ডাবল ছাপাইয়া কলিকাতায় অজস্র বিলি করিলাম, এবং মফস্বলেও নানা থানে পাঠাইয়া দিলাম। তাহাতে লিখিলাম, এ বৎসর আয"শক্তি পাব পাব বৎসরের অপেক্ষা কয়েক সহক্স (ঠিক কয় সহস্র লিখিয়ছিলাম মনে নাই) অধিক ছাপাইয়াও কিছতেই সংকুলান করিতে পারিতেছি না। দামোদরের বন্যার মত হন হন করিয়া গ্রাহকসংখ্যা যেরূপ বন্ধি পাইতেছে, তাহাতে আর অধিক দিন যে নতন গ্রাহকগণকে সম্পণে সেট কাগজ দিতে পারিব, এমন ভরসা নাই। অতএব যাহারা "আৰ্যশক্তি"র মতম গ্রাহক হইতে ইচ্ছা করেন, তাঁহারা অবিলম্বে আবেদন করুন, ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাটা কিন্তু সত্য নহে। নতন গ্রাহক মোটেই হইতেছিল না, এবং “আৰ্য্যশক্তি"র অবিক্ৰীত সংখ্যাগলি স্তপোকার হইয়া বাড়ীতে স্থানাভাব ঘটাইয়াছিল। কিন্তু ঈদশ মিথ্যাভাষণে পাপ মাই। মন বলিয়াছেন, ব্রাহ্মণের প্রাণরক্ষার জন্য মিথ্যা বলা যাইতে পারে। এরপ আড়মযর করিয়া বিজ্ঞাপন না দিলে আমার কাগজ চলে না; না চলিলে আমার প্রাণরক্ষা হয় না, কারণ এই কাগজই আমার একমাত্র জীবিকা; এবং আমি যে একজন সৎকুলীন ব্লাহ্মণ, সে কথাটা অলীক নহে। সপ্তাহকাল মধ্যে হ্যাডবিলের ফল পাইতে লাগিলাম। অনেকগুলি নুতন অর্ডার আসিল—কিছ: টাকা পাইলাম। দেন কতক কতক পরিশোধ করিলাম এবং বাকী টাকা, পজার অবকাশে দেশভ্রমণে যাইব বলিয়া রাখিয়া দিলাম। যে সময়ের কথা বলিতেছি, তখন স্বদেশী-আন্দোলন পরা দমেই চলিতেছে। বঙ্গসাহিত্যের মরা গাঙ্গেও ভাবের বান ডাকিয়া উঠিয়াছে—আমিও “আৰ্য্যশক্তি"তে উদ্দীপনাপণে বহর প্রবন্ধ, কবিতা, গান মাসে মাসে ছাপিয়া যাইতেছি। গোলদীঘি, বিডন-বাগান প্রভৃতি স্থানে প্রতিদিন তুমুল বক্তৃতা চলিতেছে; কয়েকটা সভায় আমিও বক্ততা করিয়াছি। অশ্বিনী দত্ত, বিপিন পাল প্রভৃতি জন-নায়কগণ দেশান্তরিত হইয়াছেন; আবার গজেব উঠিয়ছে, সিমলাশৈলে এক নতন তালিকা প্রস্তুত হইতেছে—আরও কয়েকজন বিখ্যাত লোককে ডিপোট করা হইবে। পাজার সংখ্যা আৰ্য্যশক্তি বাহির হইয়াছে। কাত্তিকের কপি প্রেসে দিয়া ভ্রমণে বহিগতি হইব-প্রভাতে আপিসে বসিয়া প্রবন্ধ নির্বাচন করিতেছিলাম। অনাদিবাবর একটি ধারাবাহিক উপন্যাস আর্য শক্তিতে মাসে মাসে বাহির হইতেছিল—কাত্তিকের কিসিত যথাসত্বর পাঠাইবার জন্য টেলিগ্রাম লিখিতেছি, এমন সময় একজন অপরিচিত যবেক, পাঞ্জাবী কামিজের উপর রেশমী চাদর ঝালাইয়া, ছাতা হতে আমার আপিসে প্রবেশ করিয়া বলিল, “আপনার নাম মনতোষবাব ?" “আজ্ঞে হ্যাঁ।”—ভাবিলাম বোধ হয় নতন গ্রাহক হইতে আসিয়াছে—তিনটি টাকা পাওয়া যাইবে। লোকটি আমায় নমস্কার করিয়া, বিনা আহবানেই পাশের বেঞ্চিটিতে উপবেশন করিল। ১৬৯ -