পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৭৭৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আসিল । বলিল—“ওঃ-সন্ধাংশ:?" লোকটি নীলমণিকে বাঙ্গভরে সেলাম করিয়া বলিল—“জি হজের। সেই বান্দাই বটে। ছেলেবেলা থেকে এত বন্ধত্বে—এত ভাব আর আজ সাফ চিনতে পারলে না।" “কি করে চিনতে পারব ভাই ? আজ প্রায় পনেরো বছর দেখিনি। তুমি তখন রোগা ছিলে-কালো ছিলে। এখন বেশ ফসর্ণ হয়েছ—মোটাসোটা হয়েছ।” “কেন মোটা হব না ?" পশ্চিমে থাকি, জল হাওয়া ভাল, ঘি দধ সস্তা—কেন মোটা হব না ? তুমি আছ কোথা ?” “কাছেই—১৭ নং ভীমদাসের লেনে।" “কি কর ?” "বাংগালীর ছেলের যা প্রধান অবলম্বন—কেরাণীগিরি।” "আমি লক্ষেীয়ে চাকরি করতাম—কিন্তু সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে, কদিন হল কলকাতায় এসেছি। ব্যবসা করব। গ্রেট ইস্টাণে আছি। আরও দুতিন দিন থাকতে হবে। সন্ধ্যাবেলা বাড়ী থাকবে ?” “থাকব।” “সন্ধ্যার পর আসব। ও৪-পনেরো বচ্ছর পর আজ দেখা। তোমাকেই আমার হোটেলে যেতে বলতাম: কিছু ভাই, সেখানে বড় বড় সাহেবর থাকে কিনা—তারা তোমার এই ধতি চাদর দেখলে চটেই যাবে। আমিই আসব। কোন গলি বললে ?” “১৭ নং ভীমদাসের গলি। এই কাছেই। ঐ রাস্তাটা দিয়ে খানিক গিয়ে, ডানহাতি বড় থামওয়ালা যে একটা লাল বাড়ী আছে—তারই সামনে আমার বাসা ১৭ নম্বর !" “আচ্ছা ভাই, এখন চললাম। বড় তাড়াতাড়ি। পরিবার নিয়ে আছ ত?" “হ্যাঁ। তুমি আজ সন্ধেবেলা আমারই ওখানে খাবে।” “খাব ? বেশ। রাত আটটার সময় আসব।”—বলিয়া সাধাংশ গাড়ীতে উঠিয়া গাড়োয়ানকে বলিল—“জোরসে হাঁকাও।” উপরে যে কথোপকথন লিপিবদ্ধ হইল, তাহাতে দই তিন মিনিটের অধিক কালক্ষয় হয় নাই। সাধাংশ চলিয়া গেলে নীলমণির মনে হইল, কয়েক মিনিটের জন্য একটা উল্কাপিণ্ড যেন তাহার চক্ষ বধিয়া দিয়া অদশ্য হইল। - ট্রামে উঠিয়া নীলমণি ভাবিতে লাগিল—“সন্ধাংশকে দেখিয়া আর চিনিবার যো নাই! তখন রোগা ডিগডিগে ছিল, বকের হাড় দেখা যাইত—সে এখন কেমন হইয়াছে, মানুষের মতন হইয়াছে। পয়সাই আসল জিনিষ, পয়সা থাকিলে আমারই কি আজ এমন চেহারা থাকিত : দুইজনে এক ক্লাসে পড়িতাম, আমি ছিলাম সব্বাপেক্ষা ভাল ছেলে-আমি প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাস করিয়াছিলাম, ও করে তৃতীয় বিভাগে । এফ-এ ও ত পাসই করিতে পারল না। কনিক্স-সেকসন কিছতেই উহার মাথায় চমকিত না । তখন কে জানিত, জীবন-পরীক্ষাক্ষেত্রে ও আমার এত উপরে উঠিয়া যাইবে ? লক্ষেীয়ে চাকরি করিত বলিল—কি চাকরি তাহা জিজ্ঞাসা করা হয় নাই। অবশ্য কোনও বড় চাকরিই করিত। চাকরি ছাড়িয়া ব্যবসায় করিতে আসিয়াছে—দ পয়সা জমাইয়াছে, তবে ত আসিয়াছে ? গ্রেট ইন্টাণ হোটেলে আছে বলিল—সেখানে ত দৈনিক ৮১০ টাকা করিয়া লাগে শুনিয়াছি। সাধাংশ বড়লোক হইয়াছে।” নীলমণি উক্তপ্রকার চিন্তা করিতে লাগিল—আর ট্রামও ধৰ্ম্মমতলায় আসিয়া পৌছিল । চাঁদনীর সম্মখে নামিয়া নীলমণি ভাবিল—“আজ যে উহাকে খাইতে নিমন্ত্ৰণ করিলাম— কি খাওয়াইব ? নিজেরা রোজ যা ডাল ভাত শাক চচ্চড়ি খাই—তাহা কি উহার পাতে দিতে পারিব ? বাল্যকালের বন্ধ, আজ কতদিন পরে সাক্ষাৎ হইয়াছে সে একটা হোজিপেজি লোকও নহে-রীতিমত খাতির করিতে হইবে ত!” এই ভাবিয়া নীলমণি চাঁদনীতে ঢকিয়া খোকার গলাবন্ধ ও মোজা মাত্র লইয়া, বাকী টাকায় মিউনিসিপ্যাল মাকেট হইতে দেড় সের মটন, একটা ভেটকি মাছ ও কুড়িটা কমলালেব; কিনিয়া বাড়ী আসিল । ԶԵՑ