পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ফেলে তুমি কাছারি চলে যাবে।” “কাছারি গিয়ে খুব শিগগির শিগগির ফিরে আসব।” দয়া ভাবিয়া দেখিল, তা হইতে পারে বটে। কিন্তু বাধা বিপত্তি যে অনেক! “তুমি ত নিয়ে যাবে, সবাই যেতে দেবে কেন ?” “এখান থেকে কি নিয়ে যাব ? যখন শনিব তুমি বাপের বাড়ী রয়েছ তখন চুপি চপি এসে তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে যাব।” শুনিয়া দয়া হাসিল। এও কি সম্ভব নাকি ? “কতদিন আমরা থাকব সেখানে ?” “অনেক বচ্ছর থাকব।” দয়া মচকি মচকি হাসিতেছিল, সহসা একটা কথা তার মনে পড়িয়া গেল। বলিল —“খোকাকে ফেলে কি অনেক বচ্ছর আমি বিদেশে থাকতে পারব ?” উমাপ্রসাদ সত্রীর গালে গাল রাখিয়া কাণের কাছে বলিল—“ততদিন তোমারও একটি খোকা হবে।” কথাটি শনিয়া দয়ার ওঠপ্রান্ত হইতে কণমল পৰ্য্যন্ত লজ্জায় রাঙ্গ হইয়া উঠিল। কিন্তু অন্ধকারে তাহা কেহ দেখিতে পাইল না। উল্লিখিত খোকাটি উমাপ্রসাদের জ্যেষ্ঠ সহোদর তারাপ্রসাদের একমাত্র সন্তান। স্বয়ং উমাপ্রসাদ এ বাটীর শেষ খোকা। এই পরিবারে খোকা-রাজার সিংহাসন বহুকাল শুন্য ছিল, তাই খোকার বড় আদর; খোকা বাড়ীসন্ধ সকলের চক্ষে মণি । খোকার মা হরসন্দেরী,—তাঁর ত আর গরবে মাটিতে পা পড়ে না। দয়া সহসা বলিল—“আজ এখনো খোকা এল না কেন ?”—ভোর রাষ্ট্রে রোজ খোক। কাকীমার কাছে আসে। এটি তার নিত্য নৈমিত্তিক কাৰ্য্য। যদিও বাটীতে দাসদাসীর অভাব নাই, তথাপি গহকায্যের অধিকাংশ দয়া স্বহস্তে করিত। বিশেষতঃ তাহার সবশরের পজাহিক সম্পকীয় যাহা কিছু কাৰ্য্য তাহাতে দয়া ছাড়া অপর কাহারও হস্তসপশ করিবার অধিকার ছিল না। সারাদিন এই সমস্ত কাযে ব্যস্ত থাকিয়াও খোকাকে সে একমহত্তেও চক্ষের আড়াল করিত না। কাকীমা গা মছাইয়া না দিলে খোকা গ৷ মছে না, কাকীমা কাজল না পরাইয়া দিলে খোকা কাজল পরে না, কাকীমার কোলে ভিন্ন অন্য কোথাও শইয়া খোকা দুধ খায় না। খোকার বিছানায় তার কাকীমা অনেক রাত্রি অবধি থাকিয়া ঘুম পাড়াইয়া আসে,—ভোর রাত্রে ঘুম ভাগিলেই খোকা কাক্কীম বলিয়া কান্না যুড়িয়া দেয়। এই প্ৰগলভতা, এই অন্যায় আবদারের জন্য মধ্যে মধ্যে তাহাকে হরসন্দরীর নিকট হইতে চড়টা চাপড়টা পরস্কার পাইতে হয়। কিন্তু বলাই বাহুল্য তাহাতে কান্না না থামিয়া আরও দশগুণ বাড়িয়া উঠে। তখন হরসন্দরী তাহাকে কোলে করিয়া, ক্ৰোধে ও নিদ্রাঘোরে টলিতে টলিতে দয়ার শয়নকক্ষের বারে আসিয়। ডাকেন—“ছোট বউ ও ছোট বউ, এই নে তোর খোকাকে।” বলিয়া, দয়ার দয়ার খুলিবার অপেক্ষা না রাখিয়াই, খোকাকে মাটিতে বসাইয়া প্রস্থান করেন। দয়া প্রায়ই জাগিয়া থাকে, না থাকিলেও খোকার কুন্দনে শীঘ্রই জাগিয়া উঠে, ছটিয়া আসিয়া খোকাকে বকে করিয়া লইয়া যায়, “কে মেরেছে, কে মেরেছে” বলিয়া কত সোহাগ করে। মাথার শিয়রে পাণের ডিবায় কোনও দিন কদমা, কোনও দিন বাতাসা, কোনও দিন নারিকেল নাড় সঞ্চিত থাকে, তাই খোকা ভক্ষণ করে, তাহার পর নিশ্চিন্ত হইয়া কাকীমার কোলে শুইয়া ঘামাইয়া যায়। আজ এখনও খোকা আসিল না বলিয়া দয়া কিছু উৎকণ্ঠিত হইল। বলিল-- “বাছার অসুখ বিসুখ করেনি ত?" উমাপ্রসাদ বলিল—“বোধ হয় এখনও রাত্রি আছে। দেখি দাঁড়াও ” উমাপ্রসাদ বিছানা হইতে উঠিয়া জানালা খলিল। বাহিরে আম ও নারিকেল ব্যক্ষধহল বাগান। তখনও চন্দ্রাস্ত হয় নাই—কিন্তু অধিক বিলম্বও নাই। দয়া নিঃশব্দে আসিয়া স্বামীর পাশেব দাঁড়াইল । —“রাত আর বেশী কই ?” শীতের হিমবায় হল হয় করিয়া জানালা-পথে প্রবেশ করিতে লাগিল। তব দুজনে o