পাতা:প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র.djvu/৯১৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তাঁর এতই বেশী অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়ছে যে, লোকের সঙ্গে আলাপ করিতে করতে মাঝে মাঝে ইংরাজি কথা মিশাইয়া ফেলেন—অজ্ঞ লোকের সুবিধাথ আবার তাহা বাঙ্গলা করিয়া বঝাইয়াও দেন। বলেন, পাবে পিতার জীবিতকালে, একদিন কলিকাতার গঙ্গার ধারে মাস্টার মহাশয় নাকি বেড়াইতেছিলেন, তথায় এক সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথাবাৰ্ত্ত হয়। সাহেব তাঁহার ইংরাজি শনিয়া, লাট সাহেবের নিকট সে গল্প করিয়াছিলেন। লাট সাহেব মাটির মহাশয়কে ডাকিয়া পঠাইয়া, ডেপটি কালেক্টারি পদ তাঁহাকে দিবার প্রস্তাব করেন। কিন্তু তখন তিনি বাপের বেটা, সংসারের চিন্তা ছিল না, সেই প্রস্তাব তিনি বিনীত ভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। আজ অভাবে পড়িয়া এই ২৫, টাকার চাকরি তাঁহাকে স্বীকার করিতে হইল! পরষস্য ভাগ্যং !—মাটর মহাশয়ের মখে এইরুপ কথাবাত্ত শুনিয়া এবং তাঁহার ইংরাজিয়ানা চাল চলন দেখিয়া গ্রামের লোক একেবারে মোহিত হইয়া গেল। হীর দত্তের প্রতিজ্ঞা অনুসারে, পরদিনই ইস্কুল খলিল। পনেরো যোলটি ছাত্র লইয়া মাছটার মহাশয় অধ্যাপনা আরম্ভ করিলেন। কলিকাতা হইতে (দন্তজার বয়ে) তিনি প্রচর পরিমাণে সেলেট, পেন্সিল ও মরে সাহেবের পেলিং বক পস্তক খরিদ করিয়া ছাত্ৰগণের উৎসাহ বন্ধনাথ সেগুলি তাহাদিগকে বিনামলোই দেওয়া হইতে Iাগল। গোঁসাইগঞ্জের লোকের সঙ্গে নদীপরের লোকের পথে ঘাটে দেখা হইলে, উভর গ্রামের মাস্টার সম্বন্ধে আলোচনা হইত। গোঁসাইগঞ্জ বলিত—“বদ্ধমানের মন্টার, ও জানেই বা কি, আর পড়বেই বা কি!” নন্দীপর বলিত—“হলেই বা আমাদের মাস্টারের বন্ধমানে বাড়ী, তিনিও ত কলকাতাতেই লেখাপড়া শিখেছেন। ওঁরা যখন পড়তেন, তখন কি বদ্ধমানে ইংরেজি ইস্কুল ছিল ? কলকাতায় গিয়ে ইংরেজি পড়তে হত।” যথা সময়ে উভয় গ্রামের বারোয়ারী পাজার উৎসব আরম্ভ হইল। উভয় গ্রামই উভয় গ্রামের লোকদিগকে প্রতিমা দশন, প্রসাদ ভক্ষণ, যাত্রা ও ঢপ সঙ্গীত শ্রবণের নিমন্ত্রণ করিল। এই উপলক্ষে উভয়.মাটারের দেখা সাক্ষাৎ হইয়া গেল এবং সভাস্থলে প্রকাশ পাইল, উভয়ে পর্বোবধি পরিচিত। পজান্তে গোঁসাইগঞ্জ একটা কথা শুনিয়া বড়ই উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল। নদীপরের মাস্টার নাকি বলিয়াছেন—“ঐ বেজা বঝি ওদের মাস্টার হয়ে এসেছে, তা এদিন জানতাম না। ওটা ত মহামখে ! ছেলেবেলায় কলকাতায় আমরা এক কেলাসে পড়তাম কিনা। আমরা যখন সেকেন ব্যক পড়ি, সেই সময়েই ও ইস্কুল ছেড়ে দেয়। তারপর আর ত ও ইংরেজি পড়েনি। বড়বাজারে এক মহাজনের আড়তে খাতা লিখত, মাইনে ছিল সাত টাকা। গেল বছরও ত কলকাতায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়; তখনও ত ঐ চাকরি করছে।” গোঁসাইগঞ্জবাসীরা ব্ৰজ মাস্টারকে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এ কে শনছি ?” ব্ৰজ মাস্টার এ প্রশন শুনিয়া হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন—“একেই বলে কলিকাল। সেকেন বকে পড়ার সময় আমি ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছিলাম, না ও-ই ছেড়ে দিয়েছিল ? হয়েছিল কি জান না বুঝি - মাস্টার কেলাসে রোজ পড়া জিজ্ঞাসা করতো, ও একদিনও বলতে পারতো না। মাস্টার একদিন ওকে একটা কোন্টেন জিজ্ঞাসা করলে ও এনসার করতে পারলে না। আমায় জিজ্ঞাসা করতেই আমি বললাম। মাস্টার আমায় বললে, দাও ওর কাণ মলে। আমি কাণ মলে দিতেই, ওর মুখচোখ রাগে রাঙা হয়ে গেল। ও বলতে লাগলো, আমি হলাম বামনের ছেলে, ও কায়েত হয়ে কিনা আমার কাণে হাত দেয়। সেই অপমানে ও-ই ত ইস্কুল ছেড়ে দিলে। আমি তার পর পাঁচ ছ’ বছর সেই ইস্কুলে পড়ে, একেবারে লায়েক হয়ে তবে কেরলাম।” অতঃপর গোঁসাইগল্পের লোক, নন্দীপর কর্তৃক ব্যক্ত ঐ অপবাদের প্রতিবাদ করিতে ७ २8