পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১০২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ՋԵ বকাউল্লা ঠিক চিনিতে পারিল না। অন্ধকার রাত্রে সে প্রতাপ ও রামচরণকে দেখিয়াছিল—সুতরাং ভাল চিনিতে পারিল না । কিন্তু তাহীর ভগ্ন হস্তের যাতনা অসহ্য হইয়াছিল-যে কেহ তাহার দায়ে দায়ী। বকাউল্লা বলিল, “হ্যা, ইহারাই বটে।" * তখন ব্যাভ্রের মত লাফ দিয়া ইংরেজেরা সিড়ির উপর উঠিল । সিপাহীরা পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিল দেখিয়া, রামচরণ উৰ্দ্ধশ্বাসে প্রতাপের বন্দুক আনিতে উপরে উঠিতে লাগিল । জনসন তাহা দেখিলেন, নিজ হস্তের পিস্তল উঠাইয়া রামচরণকে লক্ষ্য করিলেন । রামচরণ চরণে আহত হইল, চলিবার শক্তিরহিত হইয়া বসিয়া পড়িল । প্রতাপ নিরস্ত্র, পলায়নে অনিচ্ছুক এবং পলায়নে রামচরণের যে দশ ঘটিল, তাহাও দেখিলেন । প্রতাপ ইংরেজদিগকে স্থিরভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা কে ? কেন আসিয়াছ ?” গল্‌ষ্টন্‌ প্রতাপকে জিজ্ঞাস করিলেন, “তুমি কে ?” প্রতাপ বলিলেন, “আমি প্রতাপ রায় ।” সে নাম বকাউল্লার মনে ছিল । বজরার উপর বন্দুক হাতে প্রতাপ গৰ্ব্বভরে বলিয়াছিলেন, “শুন, অামার নাম প্রতাপ রায় ।" বকাউল্লা বলিল, “জনাব, এই ব্যক্তি সরদার ” জমৃসন প্রতাপের এক হাত ধরিল, গল্‌ষ্টন আর এক হাত ধরিল । প্রতাপ দেখিলেন, বলপ্রকাশ অনর্থক । নিঃশব্দে সকল সহ্য করিলেন । নাএকের হাতে হাতকড়ি ছিল, প্রতাপের হাতে লাগাইয়া দিল । গলুপ্তম্ পতিত রামচরণকে দেখাষ্টয়া জিজ্ঞাস করিলেন, “ওটা ?” জনসন দুষ্ট জন সিপাহীকে আজ্ঞ। দিলেন ষে, “উহাকেও লইয়। আউস ।” তই জন সিপাহী রামচরণকে টানিয়া লইয়া চলিল । এই সকল গোলযোগ শুনিয়া দলনী ও কুলসম জাগরিত হইয়া মহাভয় পাইয়াছিল । তাহার কক্ষদ্বার ঈষন্মাত্র মুক্ত করিয়া এই সকল দেখিতেছিল । সিড়ির পাশে তাহীদের শয়নগৃহ । যখন ইংরেজের প্রতাপ ও রামচরণকে লইয়। নামিতেছিলেন, তখন সিপাহীর করস্থ দীপের আলোক অকস্মাৎ ঈষন্মুক্ত দ্বারপথে দলনীর নীলমণিপ্রভ চক্ষুর উপর পড়িল । বকাউঞ্জ। সে চক্ষু দেখিতে পাইল । দেখিয়াই বলিল, “ফষ্টর সাহেবের বিবি ।” গল্‌ষ্টন জিজ্ঞাসা করিলেন, “সত্য ও ত ! কোথায় ?” বকাউল্লা পুৰ্ব্বকথিত দ্বার দেখাইয়া কহিল, ঐ घरघ्न !” t জনৃসন ও গল্‌ষ্টন ঐ কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিলেন । দলনী এবং কুলুসম্কে দেখিয়া বলিলেন, “তোমরা আমার সঙ্গে আইস ।" দলনী ও কুল্সম্মহ ভীত এবং লুপ্তবুদ্ধি হইয়া র্তাহাদিগের সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন । সেই গৃহমধ্যে শৈবলিনীই এক রহিল। শৈবলিনীও সকল দেখিয়াছিল । অষ্টম পরিচ্ছেদ পাপের বিচিত্র গতি যেমন যবনকন্যারা অল্প দ্বার খুলিয়া আপনাদিগের শয়নগুহ হইতে দেখিতেছিল, শৈবলিনীও সেইরূপ দেখিতেছিল । তিন জনই স্ত্রীলোক, সুতরাং স্ত্রীজাতি সুলভ কুতূহলে তিন জনেই পীড়িত ; তিন জনেই ভয়ে কাতরা । ভয়ের স্বধৰ্ম্ম ভয়ানক বস্তুর দর্শন পুনঃ পুনঃ কামনা করে । শৈবলিনীও আদ্যোপাস্ত দেখিল । সকলে চলিয়া গেলে গৃহমধ্যে আপনাকে একাকিনী দেখিয় শযেiাপরি বসিয়| শৈবলিনা চিন্তা করিতে লাগিল । ভাবিল- “এখন কি করি ? এক, তাহাতে তামার ভয় কি ? পৃথিবীতে আমার ভয় নাই, মৃত্যুর অপেক্ষ বিপদ নাই ! যে স্বয়ং অহরহুঃ মৃত্যুর কামনা করে, তাহার কিসের ভন্ন ? কেন আমার সেই মৃত্যু হয় না ? আত্মহত্য বড় সহজ । সহজষ্ট বা কিসে ? এত দিন জলে বাস করিলাম, কৈ, এক দিনও ত ডুবিয়া মরিতে পারিলাম না । রাত্রে যখন সকলে ঘুমাইত, ধীরে ধীরে নৌকার বাহিরে অসির। জলে ঝাপ দিলে কে ধরিত ? পরিত-নৌকায় পাহারা থাকিত । কিন্তু আমিও ত কোন উদ্যোগ করি নাই । মরিতে বাসনা, কিন্তু মরিবার কোন উদ্যোগ করি নাই –তখনও আমার আশা ছিল—আশা থাকিতে মানুষে মরিতে পারে না । কিন্তু আজি ? আজি মরিবার দিন বটে । তবে প্রভাপকে বাধিয়া লইয়। গিয়াছে—প্ৰতাপের কি হয়, তাহ! ন! জানিয়। মরিতে পারিব না । প্রতাপের কি হয় ? যা হোক না, আমার কি ? প্রতাপ তামার কে ? আমি তাঙ্গর চক্ষে পাপিষ্ঠ— সে আমার কে ?—কে তাহ জানি না । সে শৈবলিনীপতঙ্গে জলন্ত বহ্নি—সে এই সংসার প্রাস্তরে আমার পক্ষে নিদাঘের প্রথম বিদ্যুৎ—সে আমার মৃত্যু । আমি কেন গৃহত্যাগ করিলাম, মেচ্ছের সঙ্গে