পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১২৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চন্দ্রশেখর তালবৃক্ষপরিমিত হইল, অতি ভয়ঙ্করী ! দেখিল, সেই গুহাপ্রান্তে সহসা নরকস্থষ্টি হইল -সেই পূতিগন্ধ, সেই ভয়ঙ্কর অগ্নিগর্জন, সেই উত্তাপ, সেই শীত, সেই সপরিণ্য, সেই কদৰ্য্য কাটরাশিতে গগন অন্ধকার। দেখিল, সেই নরকে পিশাচের। কণ্টকের রস্তুহস্তে, বৃশ্চিকের বেত্ৰহস্তে নামিল,—রজ্জ্বতে শৈবলিনীকে বাধিয়া বৃশ্চিকবেত্রে প্রহার করিতে করিতে লইয়া চলিল ; তালবৃক্ষপরিমিত প্রস্তরময়ী সুন্দরী হস্তোত্তোলন করিয়া তাহাদিগকে বলিতে লাগিল – “মার! মার! আমি বারণ করিয়াছিলাম, আমি নৌক হইতে ফিরাইতে গিয়ছিলাম, শুনে নাই । মা ! যত পরিস মার্ ! আমি উহার পাপের সাক্ষী । মীর । মীর !" শৈবলিনা বক্তকরে, উন্নত অlননে, সজল নয়নে সুন্দরীকে মিনতি করিতেছে ; সুন্দরী শুনিতেছে না ; কেবল ডাকিতেছে, “মার ! মার!” শৈবলিনা আবার সেইরূপ স্থিরদৃষ্টি লোচন বিষ্ফরিত করিয়া বি শুকমুখে স্তম্ভিতের স্তায় রহিল । চন্দ্রশেখর চিন্তিত হইলেন - ঝিলেন, লক্ষণ ভ}ল নহে । বলিলেন, “শৈবলিলি ! আমার সঙ্গে হাইস ।" প্রথমে শৈবলিনী শুনিতে পাইল ন! । পরে চন্দ্রশেখর তাহার অঙ্গে হস্তপ করিয়া দুষ্ট তিনবার সঞ্চালিত করিম। ডাকিতে লাগিলেন, পলিতে লাগিলেন, “সামীর সঙ্গে আইস ।" সহস শৈবলিন দাড়াই উঠিল, অতি ভী স্বরে সলিল, “চল চল চল, শীঘ্ৰ চল, শীঘ্ৰ চল, এখান শীঘ্ৰ চলে " বলিয়াই বিলম্ব না করিয়৷ গুহা দ্বার মুখে ছুটিল, চন্দ্রশেখরেব প্রতীক্ষা না করিয়া, দ্রুতপ:ে চলিল, দ্রুত চলিতে, গুঙ্গর অস্পষ্ট আলোকে পদে শিলাখণ্ড বাজিল: পদস্থলি ত হইয়। শৈবলিন ভূপতিত। হইল । আর শব্দ নাই । চন্দ্রশেখর দেখিলেন, শৈব লিনী আবার মূচ্ছিতা হইয়াছে । তখন চন্দ্রশেখর তাহাকে ক্রোড়ে করিয়া, গুহা হইতে বাহির হইয়া, যথায় পৰ্ব্বতাঙ্গ হইতে অতি ক্ষীণা নিঝরিণী নিঃশব্দে জলোদৃগার করিতেছিল – তথায় আনিলেন । মুখে জলসেক করাতে এবং অনাবৃত স্থানের অনবরুদ্ধ বায়ুস্পর্শে শৈবলিনা সংজ্ঞালাভ を ジ T. で。 托 百ෂ করিয়া চক্ষু চাহিল—বলিল, “আমি কোথায় আসিয়াছি ?” চন্দ্রশেখর বলিলেন, “আমি তোমাকে বাহিরে আনিয়াছি।” শৈবলিনী শিহরিল—আবার ভীত হইল। বলিল, “তুমি কে ?” চন্দ্রশেখরও ভীত হইলেন । বলিলেন, ওয়--- ১৬ 8> “কেন এরূপ করিতেছ ? আমি যে তোমার স্বামী --চিনিতে পারিতেছ না কেন ?” শৈবলিনী হা হা করিয়া হাসিল, বলিল— “স্বামী আমার সোনার মাছি বেড়ায় ফুলে ফুলে, তেকাটাতে এলে, সখা, বুঝি পথ ভুলে ? তুমি লরেন্স ফষ্টর ?” চন্দ্রশেখর দেখিলেন যে, যে দেবীর প্রভাবে এই মনুষ্যদেহ সুন্দর, তিনি শৈবলিনীকে ত্যাগ করিয়া যাইতেছেন—বিকট উন্মাদ আসিয়া তাহার সুবর্ণমন্দির অধিকার করিতেছে । চন্দ্রশেখর রোদন করিলেন । অতি মৃদুস্বরে, কত অাদরে আবার ডাকিলেন, “শৈবলিনি !” শৈবলিনী আবার হাসিল, বলিল, “শৈবলিনী কে ? রসো রসে । একটি মেয়ে ছিল, তার নাম শৈবলিনী, আর একটি ছেলে ছিল, তার নাম প্রতাপ ! এক দিন রাত্রে ছেলেটি সাপ হয়ে বনে গেল - ময়েটি ব্যাঙ হয়ে বনে গেল । সাপটি ব্যাঙটিকে গিলিয়। ফেলিল । আমি স্বচক্ষে দেখেছি। হ্যা গ৷ সাহেব ! তুমি কি লরেন্স ফষ্টর ?” চন্দ্রশেখর গদগদ কণ্ঠে সকাতরে ডাকিলেন, “গুরুদেব, এ কি করিলে ? এ কি করিলে ?” শৈবলিনী গীত গামিল,— “কি করিলে প্রাণসখী, মনচোরে ধরিয়ে । ভাসিল পরিতি-নদী দুই কুল ভরিয়ে " বলিতে লাগিল, “মনচোর কে ? চন্দ্রশেখর। ধরিল কাকে ? চন্দ্রশেখরকে । ভাসিল কে ? চন্দ্রশেখর । দুই কুল কি ? জানি না । তুমি চন্দ্রশেখরকে চেন ?" চন্দ্রশেখর বলিলেন, “আমিই চন্দ্রশেখর।” শৈবলিনী ব্যাখ্রীর ন্যায় ঝাপ দিয়া চন্দ্রশেখরের কণ্ঠলগ্ন হুইল--কোন কথা না বলিয়া কঁাদিতে লাগিল —কত কঁদিল—তাহার অশ্রুজলে চন্দ্রশেখরের পৃষ্ঠ, কণ্ঠ, বক্ষ, বস্ত্র, বাহু প্লাবিত হইল। চন্দ্রশেখরও কাদিলেন। শৈবলিনা কাদিতে কঁাদিতে বলিতে লাগিল, —“আমি তোমার সঙ্গে যাইব ।” চন্দ্রশেখর বলিলেন, “চল ।” শৈবলিনী বলিল, “আমাকে মারিবে না ?” চন্দ্রশেখর বলিলেন, “না।” দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া চন্দ্রশেখর গাত্ৰোখান করিলেন । শৈবলিনীও উঠিল । চন্দ্রশেখর বিষঃবদনে চলিলেন—উন্মাদিনী পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল— কখনও হাসিতে লাগিল—কখনও কঁাদিতে লাগিল— কখনও গায়িতে লাগিল ।