পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৩৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চন্দ্রশেখর আর ভাল করিয়া কথা কহিতেছে না। দুই একবার উঠিয়া যাইবার উপক্রম করিল। আমীর হোসেন অনুরোধ করিয়া তাহাকে বসাইলেন। আমীর হোসেনের মনে মনে হইতেছিল যে, এ ফষ্টরের কথা জানে, কিন্তু বলিতেছে না । - ফষ্টর কিয়ৎক্ষণ পরে আপনার টুপী লইয়। মাথায় দিয়া বসিল । আমীর হোসেন জানিতেন যে এটি ইংরেজদিগের নিয়মবহির্ভূত কাজ। আরও, যখন ফষ্টর টুপী মাথায় দিতে যায় তখন তাহার শিরস্থ কেশশুষ্ঠ আঘাত চিহ্নের উপর দৃষ্টি পড়িল । ষ্ট্যাল্কার্ট কি আঘাতচিহ্ন ঢাকিবার জন্ত টুপী মাথায় দিল ! আমীর হোসেন বিদায় হইলেন। আপন শিবিরে আদিয়া কুল্সম্কে ডাকিলেন, তাহাকে বলিলেন, “আমার সঙ্গে অায় ।" কুলুস তাহার সঙ্গে গেল । কুলসমূকে সঙ্গে লইয়। আমীর হোসেন পুনৰ্ব্বার সমরুর তাম্বুতে উপস্থিত হইলেন । কুলুসমূ বাহিরে বহিল। ফষ্টর খনও সমরুর তাম্বুতে বসিয়াছিল। আমীর হোসেন সমরুকে বলিলেন, “যদি আপনার অগুমতি হয়, তবে আমার এক জন লাদা আসিয়। আপনাকে সেলাম করে । বিশেপ কার্য্য আছে !" সমরু অনুমতি দিলেন । ফষ্টরের হৃৎকম্প হইল – সে গাত্রে থান করিল । আমীর হোসেন হাসিয়া হাত ধরিয়া তাহাকে বসাইলেন ; কুলুসম্কে ৬াকিলেন । কুল্‌সমৃ আসিল : ফক্টরকে দেখিয়া নিস্পদ হইয়। দাড়াইল । আমীর হোসেন কুলুসমূকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে এ ?” কুল্সম্বলিল, “লরেন্স ফষ্টর ।” আমীর হোসেন ফষ্টরের হাত ধরিলেন । ফষ্টর বলিল, “আমি কি করিয়াছি ?” আমীর হোসেন তাহার কথার উত্তর না দিয়৷ সমরুকে বলিলেন, “সাহেব ! ইহার গ্রেপ্তারের জন্য নবাব নাজিমের অনুমতি আছে। আপনি আমার সঙ্গে সিপাহী দিন, ইহাকে লইয়া চলুক।” সমরু বিস্মিত হইলেন, বলিলেন, “বৃত্তান্ত কি ? আমীর হোসেন বলিলেন, “পশ্চাৎ বলিব ।” সমরু সঙ্গে প্রহরী দিলেন, আর্মীর হোসেন ফষ্টরকে বাধিয়া লষ্টয়া গেলেন। so ులి পঞ্চম পরিচ্ছেদ আবার বেদগ্রামে বহুকষ্ট্রে চন্দ্রশেখর শৈবলিনীকে স্বদেশে লইয়া আসিয়াছিলেন । বহুকাল পরে অবির গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন । দেখিলেন, সে গৃহ তখন অরণ্যাধিক ভীষণ হইয়৷ আছে । চালে প্রায় খড় নাই-প্রায় ঝড়ে উড়িয়া গিয়াছে ; কোথায় ব| চাল পড়িয়া গিয়াছে--গোরুতে খড় খাইয়। গিয়াছে – বাশবাখারী পাড়ার লোকে পোড়াইতে লইয়া গিয়াছে। উঠানে নিবিড় জঙ্গল হইয়াছে—উরগজাতি নিৰ্ভয়ে তন্মধ্যে ভ্রমণ করিতেছে। ঘরের কপাটসকল চোরে খুলিয়া লষ্টয়া গিয়াছে । ঘর খোলী—ঘরে দ্রব্যসামগ্রী কিছু নাই, কতক চোরে লইয়া গিয়াছে—কতক সুন্দরী আপন গৃহে লষ্টয়া গিন্না তুলিয়। রাখিয়াছে। ঘরে বৃষ্টি প্রবেশ করিয়া জল বসিয়াছে। কোথাও পচিয়াছে, কোথাও ছাত ধরিয়াছে। ইন্দুর, আরস্থল, বাদুড় পালে পালে বেড়াইতেছে । চন্দ্রশেখর শৈবলিনীর হাত ধরিয়া, দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া, সেই গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন । নিরীক্ষণ করিলেন যে, ঐখানে দাড়াইয়া পুস্তকরাশি ভস্ম করিয়াছিলেন । চন্দ্রশেখর ডাকিলেন, “শৈবলিনি !” শৈবলিনী কথা কহিল না, কক্ষদ্বারে বসিয়। পূৰ্ব্বস্বপ্নদৃষ্ট করবীরের প্রতি নিরীক্ষণ করিতেছিল। চন্দ্রশেখর যত কথা কহিলেন, কোন কথার উত্তর দিল লা—বিস্ফারিতলোচনে চারিদিক দেখিতেছিল--একটু একটু টিপি টিপি হাসিতেছিল--একবার স্পষ্ট হাসিয়া অঙ্গুলীর দ্বারা কি দেখাইল । এ দিকে পল্লীমধ্যে রাষ্ট হইল-চন্দ্রশেখর শৈবলিনীকে লইয়া আসিয়াছেন। অনেকে দেখিতে আসিতেছিল । সুন্দরী সৰ্ব্বাগ্রে আসিল । সুন্দরী শৈবলিনীর ক্ষিপ্তাবস্থার কথা কিছু গুনে নাই । প্রথমে আসিয়া চন্দ্রশেখরকে প্রণাম করিল। দেখিল, চন্দ্রশেখরের ব্রহ্মচারীর বেশ | শৈবলিনীর প্রতি চাহিয়া বলিল, “তা, ওকে এনেছ, বেশ করেছ । প্রয়শ্চিত্ত করিলেই হইল।” কিন্তু সুন্দরী দেখিয়া বিস্মিত হইল ষে, চন্দ্রশেখর রহিয়াছে, তবু শৈবলিনী সরিলও না, ঘোমটাও টানিল না, বরং সুন্দরীর পানে চাহিয়া খিল্‌খিল্‌ করিয়া হাসিতে লাগিল। মুন্দরী ভাবিল, “বুঝি ইংরেজী ধরণ, শৈবলিনী ইংরেজের