পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৩৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


や8 সংসর্গে শিখিয়া আসিয়াছে ” এই ভাবিয়া শৈবলিনীর কাছে গিয়। বসিল—একটু তফাৎ রহিল, কাপড়ে কাপড়ে না ঠেকে। হাসিয়া শৈবলিনীকে বলিল, “কি লা, চিনতে পারিস ?” শৈবলিনী বলিল, “পারি—তুই পাৰ্ব্বতী।” সুন্দরী বলিল, “মরণ আর কি, তিন দিনে ভুলে গেলি ?” : শৈবলিনী বলিল—“ভুলৰ কেন লো—সেই যে তুই আমার ভাত ছয়ে ফেলেছিলি বলিয়া, আমি তোকে মেরে গুড়ানাড়া কল্লম । পাৰ্ব্বতী দিদি, একটি গীত গা না ? আমার মরম কথ। তাই লো তাই । আমার শু্যামের বামে কই সে রাই ? আমার মেঘের কোলে কই সে চাদ । মিছে লে৷ পেতেছি পিরীতি-ফাদ । কিছু ঠিক পাইনে পাৰ্ব্বতী-দিদি-কে যেন নেই-— কে যেন ছিল, সে যেন নেই—কে যেন আসবে, কে যেন আসে ন!—কোথা যেন এয়েছি সেখানে যেন আসি নাই—কাকে যেন খুঁজি, তাকে যেন চিনি ন৷ ” সুন্দরী বিস্মিত হইল–চন্দ্রশেখরের মুখপানে চাহিল—চন্দ্রশেখর সুন্দরীকে কাছে ডাকিলেন । সুন্দরী নিকটে আসিলে, তাহার কর্ণে বলিলেন, “পাগল হুইয়া গিয়াছে ” সুন্দরী তখন বুঝিল । কিছুক্ষণ নীরব হইয়৷ রহিল। সুন্দরীর চক্ষু প্রথমে চক্চকে হইল, তার পরে পাতার কোলে ভিজা ভিজা হইয়। উঠিল, শেষ জলবিন্দু ঝরিল—সুন্দরী র্কাদিতে লাগিল । স্ত্রীজাতিই সংসারের রত্ন ! এই সুন্দরী আর এক দিন কায়মনোবাকে, প্রার্থনা করিয়াছিল, শৈবলিনী যেন নৌকা সহিত জলমগ্ন হুইয়া মরে । আজি সুন্দরীর ন্যায় শৈবলিনীর জন্য কেহ কাতর নহে । সুন্দরী আসিয়া ধীরে ধীরে, চক্ষের জল মুছিতে মুছিতে শৈবলিনীর কাছে বসিল—ধীরে ধীরে কথা কহিতে লাগিল—ধীরে ধীরে পূর্বকথা স্মরণ করাইতে লাগিল—শৈবলিনী কিছু স্মরণ করিতে পারিল না। শৈবলিনীর স্মৃতির বিলোপ ঘটে নাই—তাহ হইলে -পাৰ্ব্বতী নাম মনে পড়িবে কেন ? কিন্তু প্রকৃত কথা মনে পড়ে না—বিকৃত হইয়া, বিপরীতে বিপরীত সংলগ্ন হইয়া মনে আসে । সুন্দরীকে মনে ছিল, কিন্তু সুন্দরীকে চিনিতে পারিল না । সুন্দরী প্রথমে চন্দ্রশেখরকে আপনাদিগের গৃহে স্বানাহারের জন্য পাঠাইলেন ; পরে সেই ভগ্নগৃহ বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী শৈবলিনীর বাসোপযোগী করিতে প্রবৃত্ত হইলেন । ক্রমে ক্রমে, প্রতিবাসিনীরা একে-একে আসিয়া তাহার সাহায্যে প্রবৃত্ত হইল ; আবশ্বক সামগ্ৰী সকল আসিয়া পড়িতে লাগিল । এ দিকে প্রতাপ মুঙ্গের হইতে প্রত্যাগমন করিয়া, লাঠিয়াল সকলকে যথাস্থানে সমাবেশ করিয়া, একবার গৃহে আসিয়াছিলেন । গৃহে আসিয়া শুনিলেন, চন্দ্রশেখর গৃহে আসিয়াছেন । ত্বরায় তাহাকে দেখিতে বেদগ্রামে আসিলেন । সেই দিন রমানন্দ স্বামীও সেই স্থানে পূৰ্ব্বে আসিয়া দর্শন দিলেন । আহলাদসহকারে সুন্দরী শুনিলেন যে, রমাননা স্বামীর উপদেশানুসারে চন্দ্রশেখর ঔষধ-প্রয়োগ করিবেন । ঔষধ প্রয়োগের শুভলগ্ন অবধারিত হুইল । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ cgi-faz as PHY CHIC FORCE * ঔষধ কি, তাহা বলিতে পারি না, কিন্তু ইহা সেবন করাইবার জন্য চন্দ্রশেখর বিশেষরূপে আত্মশুদ্ধি করিয়া আসিয়াছিলেন । তিনি সহজে জিতেন্দ্ৰিয়, ক্ষুৎপিপাসাদি শারীরিক বৃত্তি সকল অন্যাপেক্ষ তিনি বশীভূত করিয়াছিলেন ; কিন্তু এক্ষণে তাহার উপরে কঠোর অনশন-ব্ৰত আচরণ করিয়! আসিয়াছিলেন । মনকে কয়দিন হইতে ঈশ্বরের ধ্যানে নিযুক্ত রাখিয়াছিলেন-পারমার্থিক চিন্তা ভিন্ন অন্ত কোন চিস্তা মনে স্থান পায় নাই । * অবধারিতকালে চন্দ্রশেখর ঔষধ প্রয়োগার্থ উদ্যোগ করিতে লাগিলেন । শৈবলিনীর জন্য শয্যারচনা করিতে বলিলেন ; সুন্দরীর নিযুক্ত পরিচারিক শয্যরচনা করিয়া দিল । চন্দ্রশেখর তখন সেই শয্যায় শৈবলিনীকে শুয়াইতে অনুমতি করিলেন । সুন্দরী শৈবলিনীকে ধরিয়া বলপূৰ্ব্বক শয়ন করাইল—শৈবলিনী সহজে কথা শুনে না । সুন্দরী গৃহে গিয়া স্বান করিবে—-প্রত্যহ করে | চন্দ্রশেখর তখন সকলকে বলিলেন, “তোমরা একবার বাহিরে যাও । আমি ডাকিবামাত্র আসিও ” সকলে বাহিরে গেলে, চন্দ্রশেখর করস্থ ঔষধ-পাত্র মাটীতে রাখিলেন। শৈবলিনীকে বলিলেন, “উঠিয়া ব’স দেখি ” ।